স্টাফ রিপোর্টার: রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আর্থিক অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, ঘুষ দাবি এবং নারী সহকর্মীদের যৌন হয়রানিসহ নানা অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন হাসপাতালের হিসাবরক্ষক মো. আবুল কালাম আজাদ। হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, তাকে ঘিরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাও অনেক ক্ষেত্রে ওই সিন্ডিকেটের প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করতে পারেন না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ থেকে ৭৫০ রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বহির্বিভাগের টিকিটের মূল্য ৩ টাকা হলেও বাস্তবে রোগীদের কাছ থেকে ৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রোগীরা জানান, ভাঙতি না থাকার অজুহাতে অতিরিক্ত টাকা ফেরত দেওয়া হয় না। কেউ ১০ টাকা দিলে অনেক ক্ষেত্রেই ফেরত দেওয়া হয় মাত্র ৫ টাকা। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিদিন এভাবে অতিরিক্ত প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারে দায়িত্ব পালন করছেন কাউন্টার ইনচার্জ মো. আলতাফ হোসেন। সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি সেখান থেকে চলে যান।
এ সময় আউটসোর্সিং কর্মী শিলা রানী জানান, গত দুই মাস ধরে তিনি কাউন্টারে দায়িত্ব পালন করছেন। তার ভাষ্য, ভাঙতির কারণে যে অতিরিক্ত টাকা থাকে, তা হাসপাতালের অফিস সহকারী শিব শংকরের কাছে জমা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে টিকিটের সরকারি ৩ টাকার হিসাবও তার কাছেই জমা দেওয়া হয়।
তবে অফিস সহকারী শিব শংকর অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি শুধুমাত্র সরকারি টিকিটের টাকাই গ্রহণ করেন।
গত ১৩ জুলাই (তারিখ যাচাই সাপেক্ষে) হাসপাতাল ত্যাগের আগে স্বাস্থ্য বিভাগের খাদ্য পরিদর্শক মাধবী সরকার সাংবাদিকদের কাছে একাধিক অভিযোগ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, হিসাবরক্ষক আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের কারণে তার কর্মজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল।
তিনি আরও অভিযোগ করেন রোগী বহনের ট্রলিতে খাবার পরিবহন করা হতো, যা স্বাস্থ্যবিধির পরিপন্থী।
তার কাছে খাঁটি ঘি ও মোবাইল ফোন এনে দেওয়ার দাবি করা হয়েছিল। অসুস্থ হয়ে মেডিকেল ছুটি নিতে গেলে ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। অন্যায়ভাবে সাত মাসের বেতন আটকে রাখা হয়েছিল। জিপিএফ ঋণ অনুমোদনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করা হয়।
মাধবী সরকার আরও বলেন, নতুন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা যোগদানের পর প্রথমে স্বাভাবিকভাবে কাজ করেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তারা ওই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েন।
দুদকের তদন্তেও অভিযোগ প্রমাণের তথ্য সূত্র জানায়, আবুল কালাম আজাদ পূর্ববর্তী কর্মস্থলে থাকাকালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একই ধরনের একাধিক অভিযোগ ওঠে।
এসব অভিযোগ তদন্ত শেষে ২ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখের স্বাঃ অধিঃ/শৃঙ্খলা-৫৪/২০২২/৩৭৮৩/১(৫) নম্বর স্মারকে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে তাকে তিরস্কার দণ্ড (লঘু দণ্ড) প্রদান এবং চাকরির নথিতে লাল কালি দিয়ে তা লিপিবদ্ধ করার সুপারিশ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক নারী কর্মচারী অভিযোগ করেন, হিসাবরক্ষক আবুল কালাম আজাদ তাকে একদিন অশোভন প্রস্তাব দেন। তিনি এর প্রতিবাদ করলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্য স্টাফরাও বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেন বলে দাবি করেন।
হিসাবরক্ষক মো. আবুল কালাম আজাদ তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বহির্বিভাগের টিকিট থেকে অতিরিক্ত যে টাকা এসেছে, গত তিন মাসে প্রায় ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা হাসপাতাল ফান্ডে জমা দেওয়া হয়েছে।
খাদ্য পরিদর্শকের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি খাদ্য পরিদর্শক হওয়ায় তাকে খাঁটি ঘি কিনে দিতে বলেছিলাম, যার টাকা আমি দিতাম। এছাড়া তিনি ঢাকায় যাতায়াত করতেন বলে একটি মোবাইল ফোন কিনে আনতে বলেছিলাম, সেটির মূল্যও আমি পরিশোধ করেছি। পূর্বের দুদকের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওই অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মারুফ হাসানের কার্যালয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। প্রথম দিন জানানো হয় তিনি সভায় রয়েছেন। পরদিন জানানো হয় তিনি ছুটিতে আছেন। পরে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এস. এম. মাসুদ বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।