স্টাফ রিপোর্টার: প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের ১০৪ জন গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় সাত আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করলে তা নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।
কারাগারে যাওয়া সাতজন হলেন,রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের মাহবুবুর রহমান, পোস্টাল অপারেটর নাজমুল হাসান, এমএলএসএস মো. রেজাউল আলম, পোস্টাল অপারেটর এস এম নুরুজ্জামান, পোস্টাল অপারেটর আসমা আক্তার, প্যাকার কাম মেইল ক্যারিয়ার বিউটি রানী দাস ও ডাক বিভাগের কর্মচারী নুরুল মাসুদ।
মঙ্গলবার রাজবাড়ীর অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও সদর আমলি আদালতের বিচারক হায়দার আলী এ আদেশ দেন।
মামলার বিবরণে জানা যায়, গত ৩০ জুলাই ভুক্তভোগী গ্রাহকদের পক্ষে নাছরিন আক্তার বাদী হয়ে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্রসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় মামলা করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সমন জারির আদেশ দেন।
অভিযোগে বলা হয়, রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্রসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় লেটার রাইটার শিহাব মৃধা সঞ্চয় হিসাব খোলার কথা বলে বিভিন্ন সময়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে সাদা স্লিপে দাপ্তরিক সিল ব্যবহার করে টাকা গ্রহণ করেন। ১০৪ জন গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া প্রায় দেড় কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
মামলার ১৩ আসামি হলেন,পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র, লেটার রাইটার শিহাব মৃধা, পিএলআই এজেন্ট মাহবুব মৃধা, লেটার রাইটার মাহবুবুর রহমান, পোস্টাল অপারেটর নাজমুল হাসান, ট্রেজারার পবিত্র কুমার সরকার, এমএলএসএস মো. রেজাউল আলম, পোস্টাল অপারেটর মো. গোলাম মোস্তফা বাচ্চু, এস এম নুরুজ্জামান, আসমা আক্তার, প্যাকার কাম মেইল ক্যারিয়ার বিউটি রানী দাস, ডাক বিভাগের কর্মচারী নুরুল মাসুদ ও রোকসানা আক্তার।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট অশোক কুমার ঘোষ-২, অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম লাভলু ও অ্যাডভোকেট খান মো. জহুরুল হক জানান, ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতজন আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করলে আদালত তা নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
এদিকে, গত ১২ জুলাই কুষ্টিয়া বিভাগীয় ডাক কার্যালয়ের কর্মকর্তারা ঘটনাটি তদন্তে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে আসেন।
অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা লেটার রাইটার শিহাব মৃধাকে ওই সময় ডাকঘরে পাওয়া গেলেও তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে। তার বাড়িতে খোঁজ করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, ভুক্তভোগী গ্রাহকরা ডাকঘরে গিয়ে তাদের জমা করা অর্থ ফেরতের দাবি জানাচ্ছেন।
ঘটনার পর গত ১৬ জুলাই খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের পোস্টমাস্টার জেনারেল (চলতি দায়িত্ব) কবির আহমেদের স্বাক্ষরিত এক পত্রে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত পোস্টমাস্টার জেনারেলকে সভাপতি, খুলনা সার্কেল অফিসের সুপারিনটেনডেন্ট (তদন্ত) কে সদস্যসচিব এবং ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল (তদন্ত), দক্ষিণাঞ্চল, খুলনা ও কুষ্টিয়া বিভাগের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেলকে সদস্য করা হয়।
কমিটিকে দ্রুত তদন্ত শেষ করে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ডাক বিভাগের বিধি-বিধান বা পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা সংশোধন ও নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিতে বলা হয়।
রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের নবাগত পোস্টমাস্টার শামীম আহমেদ বলেন, ২০২১ সাল থেকে শিহাব মৃধা হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে লেটার রাইটারের দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি সরকারি কর্মচারী নন। ডাক অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী এ ধরনের কর্মীরা বিভিন্ন ডাকঘরে দায়িত্ব পালন করেন। তার বিরুদ্ধে মেয়াদি সঞ্চয় হিসাব খোলার নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এতে প্রায় অর্ধশত গ্রাহকের প্রায় এক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে। গ্রাহকরা সঞ্চয়পত্রের বই না পাওয়ায় বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
তিনি আরও বলেন, গত ৬ জুলাই তিনি রাজবাড়ী ডাকঘরে যোগদান করেন। যোগদানের পর বিষয়টি জানতে পেরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। তাদের পরামর্শে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে পুলিশ মামলা করার পরামর্শ দেয়। পরে বিষয়টি কুষ্টিয়া বিভাগীয় কার্যালয় এবং সেখান থেকে খুলনা সার্কেল অফিসে জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে এ ঘটনায় মামলা করা হয়।