স্টাফ রিপোর্টার, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) অফিস ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি, হয়রানি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ, মিটার পরিবর্তন, সংযোগের ধরন পরিবর্তনসহ বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন একাধিক গ্রাহক। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো গ্রাহককে বিদ্যুৎ চুরির মামলার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। আবার আবাসিক সংযোগকে বাণিজ্যিক এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে আবাসিক সংযোগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। নতুন সংযোগের ক্ষেত্রে সরকারি ফির চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগও করেছেন গ্রাহকরা।
এ বিষয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নতুন গ্রাহকদের তথ্যসহ বিভিন্ন তথ্য চাওয়া হলেও গোয়ালন্দ ওজোপাডিকো কার্যালয়ের আবাসিক প্রকৌশলী দিনের পর দিন ঘুরিয়ে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান বলে অভিযোগ রয়েছে।
গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের নতুনপাড়া গ্রামের প্রবাসী আব্দুল কাদেরের স্ত্রী রেহেনা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, তার বাড়ির বিদ্যুৎ বিল হঠাৎ কমে যাওয়ার বিষয়টি তিনি বিল রিডার ও লাইনম্যানদের জানান। তারা মিটার পরীক্ষা করে কোনো সমস্যা নেই বলে জানান। পরে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন তার মিটার খুলে নিয়ে তাকে অফিসে যেতে বলেন।
রেহেনার দাবি, অফিসে গেলে তাকে বিদ্যুৎ চুরির অভিযোগে মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো হয় এবং এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে কান্নাকাটি করে ৬০ হাজার টাকা দেওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে ওই টাকার বিপরীতে কোনো রশিদ বা ভাউচার দেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
দেবগ্রাম ইউনিয়নের পূর্ব তেনাপচা গ্রামের আব্দুল জলিল ফকিরও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তার ভাষ্য, বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন তার মিটারে সমস্যা রয়েছে বলে জানান।
একাধিক মিটার দিয়ে পরীক্ষা করেও সমস্যা না পাওয়ার পরও তাকে মামলার ভয় দেখিয়ে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে বাধ্য হয়ে এক লাখ টাকা দেওয়ার পাশাপাশি নতুন প্রিপেইড মিটার স্থাপনের জন্য আরও ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
গোয়ালন্দ পৌর এলাকার জামতলা বাজারের খাবারের দোকানি আবুল কালাম অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডার পর তার বাড়ির সংযোগ আবাসিক থেকে বাণিজ্যিক করে দেওয়া হয়েছে। আগে যেখানে ৬-৭শ টাকা বিল আসত, বর্তমানে সেখানে তিন হাজার টাকার বেশি বিল আসছে। দীর্ঘদিন অফিসে ঘুরেও সংযোগটি পুনরায় আবাসিক করতে পারেননি বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোয়ালন্দ ওজোপাডিকো অফিসের সামনে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ঝুলন্ত মিটার দেখা যায়। ওই মিটার থেকে লাইন অনুসরণ করে প্রায় দুই হাজার মিটার দূরে একটি মুরগির খামারে সংযোগ যেতে দেখা যায়।
খামারের মালিক সুমন মোল্লা জানান, আগে তিনি পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ ব্যবহার করতেন এবং মাসে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা বিল আসত। বর্তমানে ওজোপাডিকোর সংযোগ ব্যবহার করে মাসে ৫-৬শ টাকা বিল দেন। তার দাবি, দুই-তিন মাস পরপর বিদ্যুৎ অফিসের লোকজন এসে বিল নিয়ে যান।
তবে তার দেখানো বিদ্যুৎ বিলের কাগজে সংযোগটি আবাসিক হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। অথচ সেখানে বাণিজ্যিকভাবে মুরগির খামার পরিচালিত হচ্ছে বলে সরেজমিনে দেখা গেছে।
একাধিক গ্রাহক অভিযোগ করেন, নতুন মিটার স্থাপন ও সার্ভিস সংযোগের নামে সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে। কেউ কেউ দাবি করেন, অতিরিক্ত টাকা দিলে বাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই সংযোগ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
গোয়ালন্দ উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. আইয়ুব আলী খান বলেন, গোয়ালন্দ বিদ্যুৎ অফিসে চুরি বলব না, এটা ডাকাতি। ২ হাজার ৬০০ টাকার সংযোগে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষ ও কৃষক সময়মতো সংযোগ পাচ্ছেন না। সেবার নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে। এসব অনিয়ম বন্ধ করতে হবে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে গোয়ালন্দ উপজেলা আবাসিক প্রকৌশলী মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, সংযোগ ফি বাবদ অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সরকারি ফি ২ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে নেওয়ার কথা। কোনো সিন্ডিকেটে কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রশিদ ছাড়া টাকা নেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের রাজবাড়ী জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ মামুন-অর-রশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
স্থানীয় গ্রাহকদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে বিদ্যুৎ সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।