স্টাফ রিপোর্টার, রাজবাড়ী:
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একসময় সন্ত্রাসপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত কসবামাজাইল ও পাট্টা ইউনিয়নে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও ডাকাতির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গত দুই মাসে পাংশা উপজেলায় চারটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে তিনটি হত্যাকাণ্ডই ঘটেছে ১৪ থেকে ১৯ আগস্টের মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন তুলনামূলক শান্ত থাকার পর সম্প্রতি ওই অঞ্চলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আবারও বাড়তে শুরু করেছে। তবে পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে নিয়মিত অভিযান চলছে।
গত ২২ জুন পাট্টা ইউনিয়নের ঢেপামাজাইল গ্রামের মৃত হোসেন আলী বিশ্বাসের ছেলে জামিন বিশ্বাসকে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় নিহতের ছেলে রিপন বিশ্বাস বাদী হয়ে ৪৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও প্রায় ৩০০ জনকে আসামি করে মামলা করেন। তবে মামলার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ বলে অভিযোগ পরিবারের। পরে এ মামলার অভিযুক্তরা হাইকোর্ট থেকে জামিনে বেরিয়ে আসেন।
গত ১৪ আগস্ট কসবামাজাইল ইউনিয়নের নাদুড়িয়া গ্রামের গৃহবধূ তারা খাতুনের মরদেহ সুবর্ণকোলা ইটভাটা সড়কের পাশে পাওয়া যায়। প্রথমদিকে ঘটনাটিকে সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখা হলেও নিহতের বৃদ্ধ বাবা দাবি করেন, তার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনার পর নিহতের ছেলে রাজুকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রায় ১০ দিন পর ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে আসার পর সেখানে তারা খাতুনের মৃত্যুকে সড়ক দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
এরপর নিহতের পরিবার মামলা করার প্রস্তুতি নিলেও বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা শুরু হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পাংশা ও খোকসায় কয়েক দফা দেনদরবারের পর শেষ পর্যন্ত অসহায় বৃদ্ধ বাবা তার নাতি রাজুর বিরুদ্ধে মামলা করেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
গত ১৯ আগস্ট ভোররাতে পাট্টা ইউনিয়নের ঢেপামাজাইল গ্রামের শুকুর আলী বিশ্বাস ওরফে সুরায়ের ছেলে জজ আলী বিশ্বাসকে মারধর করে হত্যার ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাশের কসবামাজাইল ইউনিয়নের বড় বাংলাট গ্রামে চুরির অভিযোগে জজ আলীকে আটক করে স্থানীয়রা। পরে গণপিটুনিতে তার মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ ওঠে। তার বিরুদ্ধে মাদক সেবন, মাদক বিক্রি ও চুরির অভিযোগ ছিল বলেও স্থানীয়রা জানান।
তবে নিহতের পরিবারের দাবি, জজ আলীকে পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় তার মা আছিয়া খাতুন বাদী হয়ে ৪৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন।
মামলার পর পাংশা মডেল থানা পুলিশ হাকিম মন্ডল ও করিম মন্ডল নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
একই দিন ১৯ আগস্ট বিকেলে পাংশা উপজেলার মৌরাট ইউনিয়নের স্বর্ণগড়া গ্রামের আনছার মাস্টার ওরফে ঠাকুরের বাগান থেকে দুই সন্তানের জননী রাবেয়া খাতুনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
রাবেয়া পৌর শহরের পূর্ব নারায়ণপুর গ্রামের হোসেন আলীর মেয়ে। এ ঘটনায় পরদিন ২০ আগস্ট নিহতের বোন রহিমা খাতুন বাদী হয়ে পাংশা মডেল থানায় মামলা করেন।
মামলার এজাহারভুক্ত প্রথম আসামি রুপিয়াট গ্রামের কাওছার মন্ডলের ছেলে জামাল মন্ডলকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি গত ১৭ আগস্ট রাতে উপজেলার কলিমহর ইউনিয়নের হাটবনগ্রাম বাজারে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনাও ঘটে। এ সময় তিনটি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান ও একটি ওষুধের দোকানে ডাকাতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
জজ আলী বিশ্বাস হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পাংশা মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ দিন-রাত অভিযান চালাচ্ছে। জেলার বাইরেও একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযুক্তদের অনেকেই এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। প্রযুক্তির সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পরপর হত্যাকাণ্ড ও ডাকাতির ঘটনায় পাংশার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে এলাকায় স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা হবে।