স্টাফ রিপোর্টার, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগ নির্ণয়ের নামে অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর অভিযোগ উঠেছে। রোগীদের অভিযোগ, চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে গেলেই একের পর এক পরীক্ষার তালিকা ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক, এসব পরীক্ষা করাতে গিয়ে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে তাদের।
উপজেলার প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে গড়ে ওঠা এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সাধারণ অসুস্থতা নিয়েও চিকিৎসকের কাছে গেলে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে চিকিৎসকের ফি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের খরচ মিলিয়ে চিকিৎসা ব্যয় অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি অতিরিক্ত কয়েকটি পরীক্ষা করানোর জন্য রোগীদের চাপ দেওয়া হয়। ফলে রোগীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আস্থাও হারাচ্ছেন।
গোয়ালন্দ উপজেলায় লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। নদীভাঙনকবলিত ও চরাঞ্চলের মানুষের সংখ্যাও কম নয়। এসব এলাকার অধিকাংশ মানুষ কৃষি, দিনমজুরি, ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ বিভিন্ন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পেশার সঙ্গে যুক্ত। ফলে চিকিৎসার পেছনে বাড়তি ব্যয় তাদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
উপজেলায় সরকারি চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তবে বিপুলসংখ্যক মানুষের তুলনায় সরকারি হাসপাতালে সেবার সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক রোগী বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা নিতে যান।
আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে টেস্ট বাণিজ্য চলছে বলে অভিযোগ করছেন রোগী ও স্বজনরা।
একজন রোগীর স্বজন বলেন, ডাক্তার দেখানোর জন্য ক্লিনিকে গেলে প্রথমেই কয়েকটি টেস্ট করতে বলা হয়। টেস্ট করাতেই অনেক টাকা চলে যায়। গরিব মানুষের জন্য এভাবে চিকিৎসা নেওয়া খুব কঠিন।
মজলিসপুর চর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আলো বেগম বলেন, হাসপাতালে ডাক্তার দেখাইছিলাম। ডাক্তার টেস্ট দিছে। পরে তারা বলল, হাসপাতালের টেস্ট নাকি ভালো না, বাইরে থেকে করাতে হবে। তাই বাইরে গিয়ে টেস্ট করাতে হইছে।
নজরুল নামে আরেক রোগী বলেন, এসব ক্লিনিকে আসলে টেস্ট না করিয়ে ফেরার উপায় নাই। ডাক্তারের রুমে ঢোকার পর সমস্যা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আগে কয়েকটি টেস্ট করতে বলে। তারপর ওষুধ লিখবে। টেস্ট না করিয়ে যেন ওষুধই লেখা যায় না।
আরেক রোগী জানান, চিকিৎসকের ফি দেওয়ার পর একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ যোগ হওয়ায় অনেক সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনার মতো অর্থও হাতে থাকে না। ফলে আর্থিক সংকটে থাকা রোগীদের চিকিৎসা মাঝপথে বন্ধ করার পরিস্থিতিও তৈরি হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ক্লিনিকে কর্মরত এক চিকিৎসক বলেন, ক্লিনিকগুলো টেস্টের আয়ের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। টেস্ট না দিলে মালিকপক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হয়। বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে আমাদের টেস্ট দিতে বাধ্য করা হয়।
এ বিষয়ে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মারুফ হাসান বলেন, চিকিৎসা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। রোগীর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কোনোভাবেই চিকিৎসাকে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝায় পরিণত করা উচিত নয়। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই বেশির ভাগ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব। হাসপাতালের পরীক্ষার মানও বাইরের তুলনায় ভালো।