স্টাফ রিপোর্টার: প্রায় ২৪ বছরের সংসার। স্ত্রী ও দুই ছেলেকে ঘিরেই ছিল তাঁর স্বপ্ন। সীমিত আয়ের মধ্যেও রিকশা চালিয়ে সঞ্চয় করেছেন টাকা, কিনেছেন জমি, গড়েছেন মাথা গোঁজার ঠাঁই। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে পরিবারকেই প্রাধান্য দিয়েছেন রফিক। কিন্তু সেই সংসার এখন অতীত। স্ত্রী ও সন্তানদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিঃসঙ্গতা, হতাশা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাঁর।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের শাহাদাত মেম্বারপাড়া এলাকার রুস্তম শেখের মেয়ে তাসলি আক্তারের সঙ্গে প্রায় ২৪ বছর আগে বিয়ে হয় রাজবাড়ী সদর উপজেলার কোলার হাট এলাকার বাসিন্দা রফিকের। তাঁদের সংসারে রয়েছে ১৯ ও ১৫ বছর বয়সী দুই ছেলে। দীর্ঘদিনের দাম্পত্য জীবনে পরিবারকে ঘিরে নানা স্বপ্ন দেখলেও শেষ পর্যন্ত সেই সংসার ভেঙে গেছে।
রফিকের চোখে কম দেখার কারণে দূরে গিয়ে রিকশা চালানো তাঁর পক্ষে কঠিন। সীমিত উপার্জন থেকেই সংসারের খরচ মিটিয়ে কিছু টাকা জমাতেন তিনি। এভাবে সঞ্চিত অর্থ দিয়ে প্রথমে পাঁচ কাঠা জমি কেনেন। শ্বশুরবাড়ির লোকজনের পরামর্শে জমিটি স্ত্রীর নামে নিবন্ধন করা হয়।
রফিকের বলেন, আমি লেখাপড়া জানিনা বলেই স্ত্রীর নামে জমি রাখা হয়েছিল। এতে তাঁর কোনো আপত্তি ছিল না। নিজের নামে হোক কিংবা স্ত্রীর নামে পরিবারের সম্পদ হিসেবেই দেখতেন সবকিছু।
পরবর্তী সময়ে গরু-ছাগল বিক্রি করে ব্র্যাক ব্যাংকে দুই লাখ টাকা জমা রাখেন ডাবল স্কিমে। সাত বছর পর সেই টাকা বেড়ে দাঁড়ায় চার লাখে। এ ছাড়া আরও পাঁচ শতাংশ জমি কেনার জন্য বায়না করেন তাঁরা। সেখানে বসবাসও শুরু করেন। রফিকের দাবি, এসব সম্পদও স্ত্রীর নামেই রাখা হয়েছিল।
তবে সবকিছু থাকার পরও সংসারে ভাঙন দেখা দেয়। রফিকের অভিযোগ, স্ত্রীর অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে এলাকায় নানা কথা ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে স্ত্রীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বাড়ি ছেড়ে বাবার বাড়িতে চলে যান।
সঙ্গে নিয়ে যান দুই ছেলেকেও। একপর্যায়ে স্ত্রী তাঁকে তালাক পাঠান। রফিকের দাবি, তিনি সবকিছু মেনে নিয়ে আবারও সংসার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্ত্রী আর সেই সংসারে ফিরতে রাজি হননি।
সংসার ভাঙার পর বদলে গেছে রফিকের জীবনযাপন। আগের মতো নিয়মিত চুলা জ্বলে না ঘরে। সারাদিন রিকশা চালিয়ে কখনো বাইরে খেয়ে নেন, আবার কখনো অনাহারেই কাটে দিন। অবসর সময়ে পদ্মার পাড়ে বসে অতীতের স্মৃতি মনে করেন। স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কথা ভেবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
রফিকের দাবি, এখন তাঁর ছেলেরাও ফোন ধরেন না। যাদের ভবিষ্যৎ গড়তে জীবনের দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করেছেন, সেই সন্তানদের সঙ্গও এখন তাঁর কাছে অধরা। জীবনের হিসাব মেলাতে গিয়ে বারবার ফিরে তাকান অতীতের দিকে। নিজের উপার্জন, সঞ্চয় আর পরিবারকে ঘিরে গড়া স্বপ্নের পরিণতি তাঁকে হতাশ করে তুলেছে।
এ বিষয়ে তাসলি আক্তারের বাবা রুস্তম শেখ বলেন, তাঁর জামাতা চোখে কম দেখেন, তাই খুব বেশি আয় করতে পারেন না। তাঁর মেয়েও বিভিন্ন সময়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। জামাতা লেখাপড়া না জানায় জমিজমা তাঁর নামে না রেখে মেয়ের নামে রাখা হয়েছিল। তবে মেয়ের বিরুদ্ধে ওঠা পরকীয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান। বর্তমানে তাঁর মেয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন।
জীবনের এই পর্যায়ে এসে রফিকের প্রত্যাশা ছিল পরিবারের মানুষের সঙ্গ, একটু মানসিক শান্তি আর আপনজনের ভালোবাসা। কিন্তু সেই সময়েই তাঁকে কাটাতে হচ্ছে একাকিত্বের মধ্যে।দীর্ঘ ২৪ বছরের সংসার, সন্তানদের ঘিরে গড়া স্বপ্ন আর সঞ্চিত সম্পদের গল্প এখন তাঁর কাছে বেদনার স্মৃতি।
অভিযোগের বিষয়ে তাসলি আক্তারের বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।