স্টাফ রিপোর্টার:
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ দৌলতদিয়া–পাটুরিয়া রুট। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী, যানবাহন ও পণ্যবাহী ট্রাক এই পথ ব্যবহার করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করে। কিন্তু রাত নামলেই এই গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটে ভিন্ন এক বাস্তবতা সামনে আসে ফেরীতে তিন তাস নামে জুয়ার ফাঁদ পেতে সংঘবদ্ধভাবে চালানো হচ্ছে ছিনতাই ও ডাকাতি।
সন্ধ্যার পর থেকেই ফেরীঘাট ও নদীপথের পরিবেশ পাল্টে যায়। যাত্রীদের ভিড়, যানজট এবং ক্লান্তির সুযোগ নিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। অভিযোগ রয়েছে, ১০-১২ জনের একটি দল ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে ফেরীতে উঠে পরিকল্পিতভাবে তাদের কার্যক্রম শুরু করে।
চক্রের সদস্যরা যাত্রী ও চালকদের ‘তিন তাস’ খেলার প্রস্তাব দেয়। একশো টাকায় তিনশো, পাঁচশোতে পনেরোশো কিংবা পাঁচ হাজারে পনেরো হাজার এমন লোভনীয় অফারে অনেকেই আকৃষ্ট হন।
প্রথমে চক্রের সহযোগীদের দিয়ে জেতানোর অভিনয় করা হয়, যাতে অন্যরা আগ্রহী হয়ে খেলায় অংশ নেয়। পরে ধাপে ধাপে প্রতারণার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একপর্যায়ে চক্রটি ভয়ভীতি সৃষ্টি করে এবং দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন করে যাত্রীদের কাছ থেকে নগদ টাকা, মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়। প্রতিবাদ করলে অনেকেই মারধর বা লাঞ্ছনার শিকার হন।
এক বাস সুপারভাইজার বলেন, এটা সাধারণ জুয়া নয়, একটি সংগঠিত সিন্ডিকেটের কাজ। অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা ছাড়া এটি সম্ভব নয়।
চুয়াডাঙ্গাগামী এক যাত্রী জানান, লোভে পড়ে খেলেছিলাম। পরে বুঝেছি, এখানে কেউ জেতে না, সবই সাজানো।
এক ট্রাকচালক বলেন, প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছি, কিন্তু নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই।
ভুক্তভোগীদের অনেকেই দাবি করেছেন, এই চক্রের সঙ্গে স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তি এবং প্রভাবশালী মহলের যোগসূত্র থাকতে পারে। এমনকি ফেরীর কিছু কর্মী বা সংশ্লিষ্টদের নীরব সমর্থনের অভিযোগও উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ফেরী কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা জানান, যাত্রীদের নিয়মিত সতর্ক করা হয় যাতে তারা এমন প্রতারণার ফাঁদে না পড়েন।
নৌপুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিয়মিত টহল ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সুযোগ পেলেই জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যদিও জনবল সীমিত হওয়ায় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
একই ধরনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে উঠলেও দৃশ্যমান কোনো স্থায়ী সমাধান না আসায় নৌরুটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগপথে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে তা সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
দৌলতদিয়া–পাটুরিয়া নৌরুট শুধু একটি যাতায়াত পথ নয়; এটি দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগধারা। তাই এই নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। নইলে ‘তিন তাস’ নামের এই প্রতারণা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।