এটা শুধু লোকজন হাঁটার জন্য প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্যে ক্ষোভ, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
স্টাফ রিপোর্টার:
দেশের অন্যতম ব্যস্ততম নৌপথ এবং একুশ জেলার প্রবেশদ্বারখ্যাত রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৫ নম্বর ফেরিঘাট নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
ঘাটটির সংস্কারকাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, জিওব্যাগে অনিয়ম এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণের অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, ২০২২ সালে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে নদীভাঙনের কবলে পড়ে দৌলতদিয়া ৫ নম্বর ফেরিঘাটটি বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ প্রায় চার বছর পর ঘাটটি পুনরায় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘাটটি চালু হলে দৌলতদিয়ায় যানবাহনের চাপ কমবে এবং ফেরি পারাপারে ভোগান্তিও অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
তবে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নির্মাণকাজে নানা অনিয়মের চিত্র। অনেক জিওব্যাগ ছিঁড়ে গেছে, আবার বেশ কয়েকটি ব্যাগে পর্যাপ্ত বালুর পরিবর্তে ইটের টুকরা, ইটের ভূসি ও মাটিযুক্ত উপকরণ ভরা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক জিওব্যাগ অর্ধেক ভর্তি অবস্থায় ব্যবহার করা হয়েছে।
নদীর পাশে সামান্য উঁচু করে যে সুরক্ষা বাঁধ তৈরি করা হয়েছে, সেটিও খুবই দুর্বল বলে দাবি স্থানীয়দের। ইতোমধ্যে কিছু জিওব্যাগ সরে গিয়ে ফাঁকা তৈরি হয়েছে। এছাড়া সাইড প্রটেকশনের নামে বাঁশ ও কাঠের অস্থায়ী কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যা ভারী যানবাহনের চাপ সামাল দিতে পারবে কি না তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এমন নড়বড়ে অবকাঠামোর ওপর দিয়ে প্রতিদিন শত শত যানবাহন ফেরিতে ওঠানামা করলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে ঈদযাত্রাকে সামনে রেখে ঘাটটি চালুর উদ্যোগ নেওয়ায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট এক প্রকৌশলীর বক্তব্য নিয়েও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ’র আরিচা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল আলম বলেন, পাঁচ নম্বর ফেরিঘাটের কাজ কোনো আলাদা বাজেটের কাজ নয়। এটি বাৎসরিক ঠিকাদারের মাধ্যমে করা হচ্ছে। এখান দিয়ে মূলত লোকজন হেঁটে যাবে, তেমন চাপ পড়বে না।
তার এ বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, যদি এটি শুধুই মানুষের চলাচলের জন্য হয়, তাহলে বাস ও অন্যান্য যানবাহন কোথা দিয়ে ফেরিতে উঠবে এ প্রশ্নের উত্তর নেই সংশ্লিষ্টদের কাছে।
স্থানীয়দের দাবি, গত রোজার ঈদে ২৫ মার্চ দৌলতদিয়ায় বাস দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত হওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনার পরও কর্তৃপক্ষের এমন দায়িত্বহীন বক্তব্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
স্থানীয় সূত্র জানায়, দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ পরিচালিত হয়ে আসছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নুরু মণ্ডলের হাত ধরে ফরিদ শেখ নামে এক ব্যক্তি ঘাটের বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহের কাজ শুরু করেন। পরে সাবেক পৌর মেয়র নজরুল ইসলাম মণ্ডল ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলীর তত্ত্বাবধানে কাজ পরিচালিত হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও উপকরণ সরবরাহকারী পরিবর্তন হয়নি। বরং নতুন করে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে।
ঘাটের কাজের দায়িত্বে থাকা ফরিদ প্রথমে দাবি করেন, তিনি শুধু বালু, ইট ও জিওব্যাগ সরবরাহ করেন। পরে তিনি জানান, স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাও এ কাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, কাজের মান যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা নিয়মিত তদারকি না করায় এবং স্বচ্ছতা না থাকায় বছরের পর বছর ধরে অনিয়ম স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কোনো উন্নয়নকাজে প্রকল্পের ব্যয়, ঠিকাদারের নাম ও কাজের সময়সীমা উল্লেখ করে সাইনবোর্ড টানানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও দৌলতদিয়া ৫ নম্বর ফেরিঘাট এলাকায় এমন কোনো সাইনবোর্ড দেখা যায়নি।
কাজের ব্যয় সম্পর্কে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা আরিচা কার্যালয়ে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। এতে স্থানীয়দের মধ্যে আরও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।