স্টাফ রিপোর্টার: পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হলে শুধু রাজবাড়ী নয়, দেশের ২৪ জেলার প্রায় সাত কোটি মানুষ এর সুফল পাবেন বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীভাঙন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কৃষি, নৌযোগাযোগ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাবাসপুর কে রাজ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে সকালে মন্ত্রী হাবাসপুরে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন করেন।
পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, হাবাসপুরের নদী একসময় লোকালয় থেকে অনেক দূরে ছিল। নদীভাঙনে ধীরে ধীরে সেটি মানুষের বসতির কাছাকাছি চলে এসেছে। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি প্রবাহের কারণে ভাঙন ও প্লাবন দেখা দেয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেয় পানির সংকট। বছরের পর বছর এ অঞ্চলের মানুষ কখনো ভাঙন-বন্যা, আবার কখনো পানির সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, শুধু রাজবাড়ী নয়, উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৪ জেলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পানির সংকট ও নদীভাঙনের ক্ষতির শিকার। এ পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের পাশাপাশি নদী-নালা ও খাল-বিলের পানির প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
পানির ন্যায্য হিস্যা প্রসঙ্গে শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, আমরা পানির ন্যায্য হিস্যা তুলবই, আদায় করব। গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হবে। নতুন চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ অন্তর্ভুক্ত করে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা ও অধিকার আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি পানি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে কারিগরি সমীক্ষা ও ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছে। এসব সমীক্ষার ভিত্তিতেই পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের সম্ভাব্যতা তৈরি হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে এবং সাত বছরের মধ্যে এর কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে আরও প্রায় ১৫ থেকে ১৭ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
তিনি বলেন, এটি শুধু রাজবাড়ীর প্রকল্প নয়, ২৪টি জেলার মানুষের উপকারের জন্য একটি বড় প্রকল্প। আমি এটাকে বাংলাদেশের একটি মাস্টারমাইন্ড প্রজেক্ট মনে করি।
পদ্মা ব্যারাজে নেভিগেশন লক ও একাধিক গেট থাকবে উল্লেখ করে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী পানি সংরক্ষণ ও সরবরাহের ব্যবস্থা থাকবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের মাধ্যমে দুই ধাপে ১১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও জোরদার হবে।
তিনি আরও বলেন, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে নদীভাঙন, বন্যা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, নৌযোগাযোগের উন্নয়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করা কঠিন। পদ্মার পাড়ের মানুষ বছরের পর বছর প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে আছেন। পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ হলে আপনাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও দাবি বাস্তবায়নের পথ তৈরি হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, কাজ শুরু হলে সাময়িকভাবে মানুষের কিছুটা কষ্ট হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ প্রকল্প এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনবে।
সারাদেশে খাল খননের উদ্যোগের কথা জানিয়ে এ্যানি বলেন, পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের কাজ দৃশ্যমান করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগণের সহযোগিতায় আগামী দিনে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে দৃশ্যমান করা হবে। এ প্রকল্পের মধ্য দিয়ে পদ্মাপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জনসভায় স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষসহ স্থানীয় বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।