স্টাফ রিপোর্টার, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) আওতায় নির্মাণাধীন একটি সড়ক ও গাইড ওয়ালের কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের নতুনপাড়া এলাকায় পৌরসভার ময়লা ফেলার ডাম্পিং স্টেশনে যাতায়াতের জন্য নির্মিত সড়কটির কাজ শেষ হওয়ার আগেই গাইড ওয়ালের বিভিন্ন অংশ ধসে পড়েছে এবং সড়কের নিচ থেকে মাটি সরে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই সড়ক ও প্যালাসাইডিং (গাইড ওয়াল) নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে রাজবাড়ীর সুবাহান নামে এক ঠিকাদার কাজটি পরিচালনা করছেন। তারা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি নির্মাণকাজে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করছেন।
প্রকল্পটির কাজ চলতি বছরের এপ্রিল মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে কয়েক দফা সংবাদ প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্টদের কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও ঢালাইয়ের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে গাইড ওয়ালের একাধিক স্থানে ফাটল ও ধস দেখা দিয়েছে। রাস্তার নিচ থেকে মাটি সরে গিয়ে বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও নিম্নমানের ২ ও ৩ নম্বর ইট দিয়ে নির্মিত গাইড ওয়ালে বড় ধরনের ফাটল দেখা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইমরান হোসেন বলেন, পুরো কাজটাই নিয়মবহির্ভূতভাবে করা হয়েছে। রাস্তার পিচ উঠে যাচ্ছে। শুনেছিলাম খোয়া ও পাথর দিয়ে মজবুত ভিত্তি করা হবে, কিন্তু সেখানে বেশি বালু ব্যবহার করা হয়েছে। গাইড ওয়ালেও শুধু ইটের ওপর সিমেন্ট-বালুর প্রলেপ দেওয়া হয়েছে, কোথাও রড ব্যবহার করা হয়নি।
এ সময় আরও কয়েকজন নারী-পুরুষ একই ধরনের অভিযোগ করে বলেন, কাজের অনিয়মের প্রতিবাদ করলে স্থানীয় এমপির নাম ভাঙিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয়। তারা জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আগে পরিদর্শনে এসে সতর্ক করলেও বাস্তবে কাজের মানের কোনো উন্নতি হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের সিডিউল অনুযায়ী গাইড ওয়াল নির্মাণে নিচ থেকে ৫০০ মিলিমিটার উচ্চতা পর্যন্ত ৩৭৬ মিলিমিটার পুরু ইটের গাঁথুনি, পরবর্তী ৫০০ মিলিমিটার অংশে ২৫০ মিলিমিটার পুরু গাঁথুনি, প্রতি ৩ মিটার অন্তর ১৫০×১৫০ মিলিমিটার প্রি-কাস্ট আরসিসি পোস্ট এবং ২০০×১৫০ মিলিমিটার ক্যাপিং বিম নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে এসব নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়নি। এছাড়া সিডিউল অনুযায়ী প্যালাসাইডিং যেখানে নির্ধারিত দূরত্বে করার কথা, সেখানে তা অনেক কম দূরত্বে নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
তাদের আরও অভিযোগ, কার্পেটিংয়ের আগে নিয়ম অনুযায়ী প্রাইম কোট ব্যবহার না করে অল্প পরিমাণ ট্যাক কোট প্রয়োগ করায় ইতোমধ্যেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে যেতে শুরু করেছে।
স্থানীয়রা জানান, রাস্তার পাশেই মরা পদ্মা নদী থাকায় এখানে শক্তিশালী প্যালাসাইডিং অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। কিন্তু নিম্নমানের নির্মাণের কারণে বর্ষা মৌসুমেই নতুন সড়কটি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর আগেও একই স্থানে নির্মিত একটি সড়ক এক বছরের মধ্যেই ভেঙে যায়।
অভিযোগের বিষয়ে দায়িত্বে থাকা ঠিকাদার সুবাহান মুঠোফোনে বলেন, বৃষ্টির মধ্যেও কাজ হচ্ছে। কোথাও সমস্যা হলে আবার করে দেওয়া হবে। ইঞ্জিনিয়ার যেভাবে কাজ করতে বলেছেন, সেভাবেই কাজ করছি। ভেঙে যাওয়া অংশ ও উঠে যাওয়া পিচ পুনরায় মেরামত করা হবে।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, কাজে যা হওয়ার কথা ছিল, আমি তার চেয়েও বেশি করিয়ে নিচ্ছি। সিডিউলে যেভাবে উল্লেখ আছে, সেভাবে করলে ব্যয় আরও বেড়ে যেত। তাই গাইড ওয়ালের দূরত্ব দুই থেকে আড়াই মিটার করা হয়েছে। বৃষ্টির মধ্যে কাজ হওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।