স্টাফ রিপোর্টার, অর্থের বিনিময়ে নয়, মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির আশায় দীর্ঘ ৭৬ বছর ধরে নিঃস্বার্থভাবে কবর খুঁড়ে আসছেন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রুস্তম ফকির।বয়সের ভারে শরীর আগের মতো সায় না দিলেও মানুষের শেষ বিদায়ের এই দায়িত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি তিনি।
কারও মৃত্যুর খবর পেলেই হাতে কোদাল-কাস্তে নিয়ে ছুটে যান রুস্তম ফকির। গভীর রাত, বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারে না। নিজের ব্যক্তিগত কাজকর্ম পাশে রেখে মৃত ব্যক্তির জন্য কবর প্রস্তুত করাকেই তিনি মানবিক দায়িত্ব হিসেবে দেখেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গোয়ালন্দ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কেউ মারা গেলে স্বজনদের পাশাপাশি রুস্তম ফকিরকেও খবর দেওয়া হয়। মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছে কবর খোঁড়ার কাজে লেগে পড়েন। দীর্ঘ জীবনে অসংখ্য মানুষের শেষ ঠিকানা তৈরির এই কাজ করলেও এর বিনিময়ে কখনো পারিশ্রমিক দাবি করেননি তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল মোল্লা বলেন, এলাকার কোথাও কেউ মারা গেলে সবার আগে রুস্তম ফকিরের কথা মনে পড়ে। খবর পেলেই তিনি নিজের ব্যস্ততা ফেলে সেখানে চলে যান। কবর খুঁড়ে দেওয়ার জন্য কখনো টাকা-পয়সা নেন না। তিনি খুবই ভালো ও বিনয়ী মানুষ। এলাকার সবাই তাকে সম্মান করেন।
রুস্তম ফকির জানান, প্রায় ৭৬ বছর ধরে তিনি মানুষের কবর খুঁড়ে আসছেন। এ কাজের পেছনে তার কোনো আর্থিক প্রত্যাশা নেই। মানুষের উপকার করতে পারলেই তিনি আনন্দ পান।
তিনি বলেন, “দশজনের যে কাজ ভালো লাগে, আল্লাহ হয়তো সেই কাজের মাধ্যমে আমাকেও ভালোবাসবেন এই বিশ্বাস থেকেই মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। কোনো পারিশ্রমিকের আশা করি না। আল্লাহকে খুশি করার নিয়তেই কবর খুঁড়ি। মানুষের জন্য এই কাজ করতে পারলেই আমার মনে শান্তি আসে।
তবে দীর্ঘ জীবনের প্রভাব পড়েছে তার শরীরেও। বয়স বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো শক্তি পান না তিনি। এখন অনেক সময় একজন সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে কবর খোঁড়ার কাজ করতে হয়। তবুও কোথাও মৃত্যুর খবর পেলে যতটা সম্ভব দ্রুত সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
বর্তমান সময়ে যেখানে অধিকাংশ সেবামূলক কাজের সঙ্গেও কোনো না কোনো প্রত্যাশা জড়িয়ে থাকে, সেখানে রুস্তম ফকিরের দীর্ঘ ৭৬ বছরের এই নিঃস্বার্থ সেবা ব্যতিক্রমী এক মানবিক দৃষ্টান্ত। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও মানুষের শেষ বিদায়ের প্রস্তুতিতে পাশে দাঁড়িয়ে চলা এই মানুষটি স্থানীয়দের কাছে তাই শুধু একজন কবরখোদক নন, বরং মানবতার এক নীরব কর্মী।