শিরোনাম
শিবালয়ে নিষিদ্ধ সময়ে যমুনার চরে দিনব্যাপী ইলিশের হাট দৌলতদিয়ার যৌনপল্লিতে যৌনকর্মীর রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার- গোয়ালন্দে কৃষকদের বাধা উপেক্ষা করে প্রভাবশালী মহল মরাপদ্মায় ড্রেজার দিয়ে অবাধে মাটি উত্তোলন করছে দৌলতদিয়া ইউনিয়ন যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক বহিস্কার গোয়ালন্দে ছাত্রলীগ নেতাকে মারধরের অভিযোগে উপজেলা সেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি আটক- গোয়ালন্দে ৭০০ গ্রাম গাঁজাসহ দুই জন আটক গোয়ালন্দ প্রবাসী ফোরামের উদ্যোগে অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান রাজবাড়ীতে শেখ হাসিনার নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে সম্মানি বিতরণ অবৈধ ড্রেজার ব্যবসায়ীকে জরিমানা, ৭টি ড্রেজার জব্দ গোয়ালন্দে অসহায় মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ এমপি কন্যা চৈতীর উদ্যোগে

গোয়ালন্দে কালের সাক্ষী হয়ে আছে জেলেপাড়ার মঠ

রনি মন্ডল | রাজবাড়ী টেলিগ্রাফ / ১৪৮ বার পড়া হয়েছে
সর্বশেষ আপডেট : শনিবার, ৫ জুন, ২০২১

0Shares

প্রায় শত বছরের পুরানো মঠটি এখানকার অতীত ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গোয়ালন্দ বিজয়বাবুর পাড়ার এই মঠমন্দির শ্রীঅঙ্গনটি এক সময় জেলে বাড়ীর মঠ নামে সমধিক পরিচিত ছিল।

পদ্মার তীরবর্তী গোয়ালন্দ ঘাটে মাছের প্রাচুর্যের কারনে এক সময় এখানে প্রায় চারশত জেলে পরিবারের বসতি ছিল। তথানুসন্ধানে যতদুর জানা যায়, গোয়ালন্দের এই জেলে পাড়ায় বাস করতেন গনেশ দাস। দূর্গা মায়ের ভক্ত গণেশ দাস জাল দড়ি নিয়ে সারারাত নৌকায় মাছ ধরতেন। স্বপ্নে আদিষ্ঠ হয়ে গনেশ দাস বাড়ির আঙিনায় বাঁশ খড় দিয়ে একটি দুর্গা মন্দির প্রতিষ্টা করেন। নিজে মাছ ধরে অতিকষ্টে সংসার চালালেও ছেলে কৈলাশ দাসকে তিনি আয়ুর্বেদীক শাস্ত্রে ডাক্তার হিসেবে গড়ে তোলেন। কালক্রমে দাস পরিবারটি বেশ অর্থ প্রতিপত্তির মালিক হয়ে ওঠেন। কৈলাশ দাসের সাত সন্তান। এরা হচ্ছেন, সতীশ দাস, বিজয় দাস, সুরেন্দ্র নাথ দাস, অবিনাশ দাস, কামদেব দাস, গজেন্দ্র দাস ও মেয়ে টবি দাস। এদের মধ্যে বিজয় দাস ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। তিনি ছিলেন একজন প্রকৌশলী, তথাপিও তিনি পুজা পার্বণে সমস্ত আয়োজন অত্যান্ত ভক্তি ও নিষ্ঠার সাথে পালন করতেন। তাই পূর্ব পুরুষের দূর্গা মন্দিরটিকে ইঞ্জিনিয়ার বিজয় দাস নিজের হাতে নক্সা তৈরি করে ১৯৩৬ সালে পূর্ণাঙ্গ ভাবে সুউচ্চ দৃষ্টিনন্দন একটি মঠ মন্দির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। মন্দিরের পূর্বদিকে নাটমঞ্চ তৈরি করেন। নাটমঞ্চের দু’পাশে একতলা বিশিষ্ট বেলকোনি তৈরি করা হয়। এই বেলকোনিতে বসে পুজাপার্বণ বা যে কোন অনুষ্টানাদি দাস বাড়ীর পরিবারবর্গ স্বাচ্ছন্দ্যে উপভোগ করতেন। মন্দিরের সম্মুখ ভাগ কারুকার্য খচিত নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে সকলেই আকৃষ্ট হতেন। নাট মন্দিরের পশ্চিম পাশে মঞ্চের গেট তৈরি করা হয়, পূর্বাংশে তাদের সিঁড়িঘরে পরিবারের সকলে থাকলেও বিজয় দাস মঠ মন্দিরের নিচে ভূগর্ভের একটি কক্ষে থাকতেন। দক্ষিণ পার্শ্বে রাধা গোবিন্দের দোলমঞ্চ ছিল। সনাতন ধর্মের বারো মাসের তেরো পার্বনের সবকিছুই ধারাবাহিক ভাবে পালন করতেন দাস পরিবার। এখানে দুর্গা পূজাতে মহিষ বলি দেওয়া হত। দুর্গাষষ্ঠি থেকে বিজয় দশমী পর্যন্ত নাটমঞ্চে ধারাবাহিক ভাবে সারারাত রামযাত্রা, কৃষ্ণযাত্রা, যাত্রাভিনয় প্রভৃতি অনুষ্টানগুলো বেশ জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্টিত হত। ভারত থেকে শিল্পীবৃন্দ এসে এসকল অনুষ্টান পরিবেশন করতেন। তাদের সাথে স্থানীয় কিছু অভিনয় শিল্পীও যোগদান করতেন। যাত্রামঞ্চে বিবেক বেশে দেবেন সাধুর মরমী কণ্ঠের গানের সুর লহরি এখনো এলাকায় জনশ্রুতি আছে।

ইঞ্জিনিয়ার বিজয় দাস এক সময় কলিকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রফেসর হিসেবে চাকুরিতে যোগদান করেন। কালক্রমে বিজয়বাবুর পরিবারবর্গ বিষয় আসয় সবকিছু ফেলে স্বাধিনতার পূূর্বেই দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান। বিজয় দাস যাবার প্রাক্কালে এ মন্দিরটি রক্ষণাবেক্ষণ দায়িত্ব স্থানীয়দের লোকজনের হাতে রেখে গেলেও মঠের কার্যক্রম আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে পড়ে। তারপর থেকে জেলে পাড়ার অনেক পরিবারই ভারতে চলে যান। তখন থেকেই হারিয়ে যেতে থাকে মঠ মন্দিরের জৌলুস। মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অযত্নে অবহেলায় এক সময় সমস্ত পুজা-পার্বন বন্ধ হয়ে যায়। দলিল দস্তখতে দেখা যায়,বিজয়বাবুর নামে অন্যান্য সম্পত্তি বাদেও শুধু মন্দির ও তার বাসগৃহ মিলেই ৮৬ শতাংশ জমি। তন্মেধ্য মঠমন্দিরের ২০ শতাংশ বাদে নাটমন্দিরের ৪০শতাংশ,এবং দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনের ২৬ শতাংশ পুকুর ছিল। রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে এসব স্থাবর- অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি বেদখল হতে থাকে। বহুদিনের অব্যবহৃত অপরিচ্ছন্ন পরিত্যক্ত মন্দিরের চারিধারে বুনোগাছ পালায় ভরে যায়। এক সময় এই মন্দিরটি পরিনত হয় সমাজের বিপথগামী তরুনদের আখড়াস্থল।

মুক্তিযুদ্ধের সময় দুষ্কৃতকারীরা নাটমন্দিরের টিন ও মন্দিরে তৈজসপত্র লুট করে নিয়ে যায় বেশ কয়েক বছর পর পরিত্যক্ত মন্দিরটিকে জাগ্রত করতে ১৯৮৫ সালে গৌরাঙ্গ দাস, বিশ্বনাথ বিশ্বাস, নারায়ণ চক্রবর্তী প্রমুখ ব্যক্তিদের উদ্যোগে সনাতন ধর্মীয় মিশন নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়। মন্দিরে জ্বেলে ওঠে আবার মঙ্গল প্রদীপ। পুনরায় শুরু হয় দুর্গাপুজা ও কালিপুজা। কিন্তু পুজানুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলে মন্দিরটি আবারও সেই তাস জুয়া নেশার আখড়ায় পরিনত হয়। লোকবলের অভাবে আস্তে আস্তে সনাতন ধর্মীয় মিশনের কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়ে।

২০০৪ সালে সমাজ সেবক( যুব সংগঠক) সুধীর কুমার বিশ্বাস গোয়ালন্দের যুব সমাজকে নিয়ে এখানে সার্বজনীন ভাবে গড়ে তোলেন শ্রীকৃষ্ণ সেবা সংঘ। গোয়ালন্দ বিজয় বাবুর পাড়া মঠ মন্দিরের নতুন নামকরণ করা হয় শ্রীকৃষ্ণ সেবা সংঘ মঠ মন্দির শ্রীঅঙ্গন। যা গোয়ালন্দের সকলের সার্বজনীন মন্দির হিসেবে গন্য হয়।
এই সংগঠনের প্রচেষ্টায় মঠ মন্দির রক্ষনাবেক্ষণ, সংস্কার, উন্নয়ন ও জমিজমা উদ্ধারের কাজ শুরু হয়। তারা মাননীয় সংসদ সদস্য রাজবাড়ী-১, জনাব আলহাজ্ব কাজী কেরামত আলি, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, মুক্তিযোদ্ধা ফকির আঃ জব্বার,গোয়ালন্দ পৌরসভা, উপজেলা এলজিইডি স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তি তথা জাতি বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সার্বিক সহযোগিতায় গোয়ালন্দের প্রাচীন ঐতিহ্য এই মন্দিরটি সংস্কারের কাজ শুরু হয়। ২০১৮ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম মন্ত্রনালয়ের অধীনে মন্দিরটি হিন্দু কল্যান ট্রাস্ট্রের তালিকাভুক্তির সনদ প্রাপ্ত হয়। নিভে যাওয়া অতীত জৌলুস ফিরে পেতে থাকে মন্দিরটিতে।

আবার পূর্বের ন্যায় শুরু হয় মন্দিরের পুজা-অর্চণা। সাথে নতুন যোগ হয়েছে শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা , মহানাম যজ্ঞানুষ্ঠান। গঙ্গাস্নান, শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী, শ্রীকৃষ্ণের ঝুলনযাত্রা। তবে গোয়ালন্দের এই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরে বর্তমানে নাট মন্দির, দুপাশের বেলকনি, বিভিন্ন দেবদেবীর মন্দির সংস্কার, মন্দিরের প্রচীর নির্মান, গেইট নির্মানসহ দুর-দুরান্তের ভক্তদের অাবাসস্থলের অভাবে নয়দিন ব্যাপি জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা এবং মহানাম যজ্ঞানুষ্ঠানে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় কমিটির সদস্যদের। সরকার মন্দিরটিকে সংস্কার করে নতুন করে নতুন রঙে শ্রীবৃদ্ধি করলেও অতীত দিনের মঠ মন্দিরের জৌলুশ আজও খুঁজে ফিরে গোয়ালন্দে বয়োবৃদ্ধ মানুষেরা।

তথ্যসুত্রঃ প্রয়াত মুকুল চন্দ্র বর্মন, নারায়ণ চন্দ্র রায়, বিশ্বরঞ্জন মেম্বর, কালিদাসী দাস, আরতি রাণী দাস প্রমুখ।

Facebook Comments


এ জাতীয় আরো খবর
NayaTest.jpg