খন্দকার লাইব্রেরী রাজবাড়ী
শিরোনাম

জলের গান

রাজবাড়ী টেলিগ্রাফ ডেস্ক / ১২৪ বার পড়া হয়েছে
সর্বশেষ আপডেট : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২০

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাজু বিশ্বাস ||

প্রচন্ড গরমে হাস-ফাঁস করছিল হাঁসটা। তার চিকচিকে কালো আর তামটের মিশেলে তৈরি পালকগুলো এই কয়দিনের ভ্যাঁপসা গরমে কেমন যেন ম্যাড়মেড়ে হয়ে গেছে। দুলারিদের টিনের একচালা ঘরের মধ্যে এক কোণায় বেশ গরম জায়গায় একটা বড় মাটির ঝালুইয়ের ভিতর খড়কুটোর গদি বানিয়ে ডিমে তা বসানো হয়েছে। ঘরের বেড়াটা যদিও খড়ের কিন্তু টিনের চালাটা বড্ড বেশি পাতলা। দুপুরবেলায় যখন সূর্য খাড়াখাড়ি চলে সেই সময় মনে হয় আগুনের গোলা এসে ভেঙে ভেঙে পড়ছে দুলারিদের ছোট্ট টিনের চালার উপর। হাঁসটা গোটা দশেক ডিম বুকে নিয়ে বসে ক্রমাগত হাঁপায় তখন। এরমধ্যে দুলারির মা করিমন বেগম মাঝে মাঝে এসে খড়ের গাদার তলা দিয়ে সাবধানে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে ডিমগুলো পরীক্ষা করে।…. কদ্দিন লাইগবেরে আর তোর বাইচ্চা ফুটতে? গলায় খানিকটা বিরক্তি নিয়ে হাঁসটাকে একপাশে ঠেলে দেয় সে। টেনেটুনে সব পরখ করে আবার জায়গা মতন বসায় তাকে। রাগে- বিরক্তিতে গজগজ করে হাঁসটা। তার আর এই অন্ধকার কুঠুরিতে বসে থাকতে মন চায় না। নদীর একটু শীতল জলের জন্য তার প্রানটা আকুপাকু করে। শুকনো খসখসে হয়ে যাওয়া তার ডানাগুলো সে আরেকবার ঝলমলে আর মসৃণ করে নিতে চায় পদ্মার নীল সবুজ পানিতে ডুবিয়ে নিয়ে।
পদ্মা নদীর মাথার উপর দিয়ে মাঝে মাঝেই টুকরো টুকরো মেঘেরা ভেসে যায়। কিন্তু তারা নেহায়েতই ফুরফুরে হাওয়ায় ভাসা শৌখিন সাদা মেঘের দল। গ্রীষ্মের শেষের এই দিনগুলোতে এতটুকু জমাট বাঁধে না তারা। গরমের চরম অবস্থা এখন। করিমন বেগমের ছয়টা ডিমই গরমে পঁচে গলে নষ্ট হয়ে যায় উশখুসে হাঁসটার বুকের তলায়! একদিন ভোরবেলা চড়াৎ চড়াৎ করে শব্দ করে তিনটা ডিম ফাটতে শুরু করে। হাঁসটা মনে হয় এই দীর্ঘ অপেক্ষাতেই ছিল। সে তড়াক করে তা দেওয়া ডিমের উপর থেকে উঠে দাঁড়িয়ে যায়। তিনটে বাচ্চা তখন ডিমের আধখানা খোলার ভিতরে ঘুরপাক খায়। একটা ডিম পায়ের তলায় থেতলে দিয়ে হাঁসটা ডাক ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে পদ্মার তীর লক্ষ্য করে।
করিমন বেগম হৈ হৈ করে ছুটে আসে। ভাঙাচোরা ডিমের খোলস আর খড়কুটোর ভেতর থেকে তিনটে ফুটফুটে হাঁসের ছানা বের করে আনে সে। আরেকটা ডিম হাতের তালুতে নিয়ে হালকা টোকা দিতেই তা থেকে বেরিয়ে আসে আরেকটি ছানা। অন্ধকার ঘরের ভিতর থেকে টিনের চালার সামনের দিকে বাড়িয়ে দেওয়া মাটির বারান্দায় আনা হয় ছানাগুলোকে। নদীর পুবদিক জুড়ে লাল থালার মতো সূর্য সকালের সোনালী রোদ ছড়াতে থাকে। দুলারি বিছানার উপর থেকে দুই হাতের উল্টোপিঠে চোখ মুছতে মুছতে চলে আসে বারান্দায়। ওমা! একি! হলুদ হলুদ পুঁটলির মতন দেখতে চারটে ছানা ঘুরে ঘুরে নাচতে শুরু করেছে তাদের মাটির দাওয়ায়। কি আজব দৃশ্য!
দুলারি মাটিতে উপুড় হয়, আবার ওঠে – আবার উপুড় হয়। আহা! কি সুন্দর দেখতে একেকটা ছানা। ঠিক গোলগাল একেকটা ছোট্ট ছোট্ট হলুদ রেশমের গুটির মতো। পায়ের কাছটাতে একদম আনকোরা বাদামি চামড়া!
নিবি তুই এগুলোকে?
দুলারির মা করিমন বেগম দশটা ডিমের থেকে মোটে চারটে ছানা দেখে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। সে কোনোমতে যেন ছোট্ট মেয়েটির হাতে ছানাগুলোকে গছিয়ে দিয়ে হাত ঝেড়ে ফেলতে চায়।
দুলারি সাথে সাথে প্রবল মাথা নাড়ে। আমারে দিবা মা? আমারে! এই চারটে ছানা আমার হবে??
হা, তোরই রইলো তাহলে। দেখাশোনা করবি। করিমন বুঝে ফেলেছে বাচ্চা না বাইরে আসতেই ফাল দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া ঐ হাঁসে আর ফিরেও তাকাবেনা ছানাগুলোর দিকে। এখন সবসময় বাড়িতে থাকা ছোট্ট দুলারিই একমাত্র ভরসা তাদের জন্য।
পদ্মা নদীর বুকে একটু একটু করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা বালুর চড়া আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। প্রথমে সেখানে এক পা দুই পা রাখা যায়। এরপর দুই হাত দশ হাত– এই করে করে আধা মাইল লম্বা চর। করিমনদের অস্হায়ী ঘর সেই চরে। ঘর বাঁধার সময় থেকেই তারা জানে, এখানে তাদের চিরদিনের বসতবাড়ি নয়। প্রথম দিকে একটা নৌকা নিয়ে এই চরে এসেছিল চাঁদ গাজী। পদ্মার বুকে রাতে জাল ফেলে মাছ ধরতো আর দিনে সেই মাছ ঘাটে দিয়ে এসে এই চরের পাড়ে নৌকা লাগিয়ে নিরিবিলি ঘুমাতো। রহিম ফকির, সমর নাথ আরো মানুষ এক এক করে এসে থাকতে শুরু করে এখানে। শরৎকালে চরের কিনারের দিকটা লম্বা লম্বা শণের জঙ্গলে ভরে যায়। সেই শণ কেটে এনে ছোট ছোট কুঁড়েঘর তৈরি করে তারা। একদিন ঐ পারের লোকালয় থেকে করিমনকে বিয়ে করে এই চরের শণের ঘরে এনে তোলে চাঁদ গাজী। শক্ত সমর্থ মেয়েটি সমানে তাল স মিলিয়ে খাটুনি খেটে সংসার গুছায়। চরের পাশে ঘরের পিছনের ফাঁকা জায়গায় বাদামের বীজ ছড়ায়, শসার বীজ ছড়ায়, লাল শাক ছড়ায়। একদিন গাছের চিকচিকে বালির ভিতর থেকে মাথা তোলে। পদ্মার বুকে সাদা বালির উপরে গাঢ় ঘন সবুজ লতানো গাছগুলো লুটোপুটি খায়। কিন্তু করিমনরা জানে, এ সবকিছুই মায়া। সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী সুখ তাদের। যখন – তখন এই জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হবে তাদের। তবু একদিন আরেকটু সুখের আশায় খড়ের বেড়ার উপরেই সস্তা টিনের একচালা তোলে চাঁদ আর করিমন। নৌকাটা সাথে সাথে থাকে তাদের। মাছ ধরা, নদীর এপার ওপার হওয়া, গঞ্জে যাওয়া, সবকিছুতেই নৌকাটিই একমাত্র ভরসা তাদের।
দুলারির চুলগুলো ঠিক শনের মতো। গোড়ার দিকে তামাটে হয়ে হয়ে আগায় এসে সোনালি ছটার আভাস। মনে হয় মাথার উপরে একটা ছোট্ট সোনালি শণের চুপড়ি বসানো। গায়ের রঙ ঘোর বাদামি। পরনের ফ্রকটার লাল রঙ চটে গিয়ে হলদেটে পাকা টমেটোর মতো হয়ে গেছে। পা দুটো খালি। জন্মের পর থেকে এই চরের পাড়ে সাত বছর কাটিয়েছে সে।
হাঁসের ছানাগুলোকে দুই হাত বাড়িয়ে পেঁচিয়ে ধরে দুলারি। মাছ ধরার একটা মাঝারি টুকরি বাবার কাছ থেকে উপহার পেয়েছিল সে। গত বছর নদীর ঐ পাড়ে বৈশাখী মেলা দেখতে গিয়ে বাবা তাকে কিনে দিয়েছিল এই টুকরিটি। চিকণ বাসের চটার বুননের উপর লাল- সবুজ হাজার পাওয়ারের রঙ করা তাতে। বারান্দার একটা বাঁশের খুঁটির সাথে ঝুলানো থাকতো টুকরিটি। দুলারি ছানাগুলোকে কোলে নিয়েই টুকরিটি পেড়ে নামিয়ে আনে সেখান থেকে। ছানাগুলোকে যত্নের সাথে নামিয়ে দেয় রঙিন টুকরির মাঝখানে। তারপর টুকরির হাতলের মত দড়িটি হাতে ঝুলিয়ে চলতে শুরু করে পদ্মার কিনারের দিকে।
হাঁসের ছানাগুলো প্রতিদিন নদীর কিনারে খেলে।
ঢেউয়ের সাথে একবার ঘুরে ঘুরে একটু দুরে চলে যায়। আবার ঢেউয়ের সাথে ডাঙায় এসে পড়ে। দুলারি একটা ছোট্ট পাকানো কঞ্চির লাঠি নিয়ে পাহারা দেয় তাদের। এই হল তার প্রতিদিনের কাজ। দুলারির মা একবার মেয়েকে স্কুলে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু স্কুল হল নদীর ঐপাড়ে। নৌকায় করে একবার দুলারিকে সেখানে দিয়ে আসতে হবে, আবার স্কুল শেষে নিয়ে আসতে হবে। এত শৌখিন সময় কোথায় পাবে চাঁদ মিয়া! নৌকা জাল নিয়ে নদীতে না পড়লে তার যে ঘরের খাবার জোগাড় করা মুশকিল! দুলারির বড় ভাই পরাণকেও কিছুদিন স্কুলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষমেশ বাবার নৌকার মাছ ধরার সহকারী হয়েছে সে। অবসর সময়ে মাকেও সাহায্য করে চর খুড়ে বাদাম বের করা বা মটর কলাই শাক তুলে বিক্রি করার কাজে। দুলারির দিন কাটে ছানাগুলোকে কোলেপিঠে করে। রাতে তাদের পাশে নিয়ে ঘুমায় সে। ঘুমের ভিতরে স্বপ্ন দেখে একটা সোনার ময়ূরপঙ্খীর নাও আসে, দুলারির পরনে তারার মতন ঝলমলে পোশাক,….. মাথায় হীরে বসানো মুকুট,….. হলুদ রেশমের গুটির মতো ছানাগুলোকে জাবড়ে ধরে কোলে নিয়ে ময়ূরপঙ্খীর নৌকায় সওয়ারি হয় সে। গভীর নীল জলের উপর দিয়ে তরতর করে এগিয়ে চলে ময়ূরপঙ্খীখানা। সেই স্রোতস্বিনী যেন পদ্মা নয়, যেন পরিচিত নয়– যেন আর কোথাও, অন্য কোনও নদী….!
একদিন টিপটপ বৃষ্টি শুরু হয়।
ঘণ মেঘ ঘোরতর অন্ধকার সাথে নিয়ে জড়ো হয় পদ্মার বুকে। অনেক দিনের জমানো ঢালু হয়ে ওঠা চরের কিনারে হঠাৎ আছড়ে আছড়ে পড়তে থাকে বড় বড় জলের ঢেউ। চরের ঝুরঝুরে বালিগুলোর গাঁথুনি আগলা হয়ে জলের মধ্যে ঝরে পড়ে যেতে থাকে। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে দুলারির বাবা চাঁদ গাজীর নৌকো জাল নিয়ে নদীতে নামা বন্ধ হয়ে গেছে। দুলারির বড়ভাই পরাণও ঘরের কোনায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঝিমায় আজ কয়দিন। দুলারির হাঁসের ছানাগুলো হাঁপিয়ে উঠেছে টুকরির ভিতর, তারাও প্রাণপণ বাইরে যেতে চায়। এদিকে কয়েকটা হাঁস মুরগী গত সপ্তাহে বিক্রি করে দিয়েছে দুলারির মা। হাতে টান পড়ছে সংসার খরচের। ঘরে বসে বসে চারটি মানুষের তিনবেলা খাওয়া দিনের পর দিন কেমনে জোগাড় হয়!
একটা মোরগ আর দুটো কালো মুরগিই অবশিষ্ট আছে দুলারির মায়ের। গতকাল সেই ডিমে তা দিয়ে ওঠা হাঁসটা ওপাড়ের বাজারে নিয়ে বিক্রি করে বৃষ্টির মধ্যে কিছু চাল ডাল কিনে এনেছিল দুলারির বাবা।
সাথে সস্তায় কিছু চালের খুদ আর ভাঙা গমের দানা দুলারির হাঁসের ছানাগুলোর জন্য। এতেই দুলারি খুশি। সকালবেলা মোটা দানার লাল আটা গরম পানির সাথে গুলিয়ে কড়াইয়ে অল্প তেল বেশ করে মেখে নিয়ে তাতে গোলানো আটার বেশ বড়সড় একেকটা দলা ছাড়ে দুলারির মা করিমন। গরম কড়াইয়ে দলাটা বেশ ছড়িয়ে দিয়ে তার উপর একটা মাটির ঢাকনা চাপিয়ে দেয়। একটু পরে ঢাকনা তুলতেই শক্ত হয়ে আসা একটা বড় রুটি কড়াইয়ের উপর থেকে যাদুর মত তুলে আনে তার মা। দুলারি অবাক বিস্ময়ে রান্নার চুলার পাশে বসে মায়ের এই আবিষ্কার দেখে। বাইরের দিকে যে ছোট্ট রান্নাঘরটা তাদের ছিল, গতকাল তা পানিতে ডুবে গেছে। একটা ছোট্ট মাটির তোলা উনুন করে রেখেছিল করিমন বেগম। বর্ষাকালে বিপদে আপদে কাজে লেগে যায় এটি। আজ সেই উনুন ঘরের দাওয়ায় পেতে রান্না চলছে। কড়াই থেকে গরম খাস্তা রুটি নামে। সাথে চারটে পেঁয়াজ দু’টুকরো করে কাটা এবং সবুজ কাঁচা মরিচ। দুলারির মায়ের রান্নাঘরের পিছনেই তিনটে মরিচ গাছ ছিল। কাল গাছগুলোর গোঁড়ায় পানি এসে জমে যাওয়ায় সব মরিচ তুলে এনেছে করিমন।
আজ দুপুরে কালো মুরগির ঝোলা রান্না হবে।
দুলারির বাবা খুব করে ধরেছে তার মাকে। সব হাঁস-মুরগিগুলো বিক্রি করে দিলা! পোলাপাইনদের চোখের সামনে দিয়ে! একটা কিছু তো মুখে দিক ওরা! আজ তাই মুরগি রেডি হচ্ছে দুপুরের খাবার জন্য।
এদিকে বাতাস ক্রমশঃ বাড়ছে। পদ্মার এইরকম চেহারা দুলারি আগে খুব বেশি দেখেনি। পরিচিত নদীর শান্ত কিনার যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। নদীর বুক থেকে কুন্ডলী পাকিয়ে বাতাসের ধোঁয়া উড়ছে যেন। হু হু করে সেই বাতাস ছুটে আসছে দুলারিদের একচালা ঘরটি লক্ষ্য করে। বাতাসে যেন নিমেষে দুমড়ে মুচড়ে দেবে দুলারিদের এই শেষ আশ্রয়টুকু।
কলকল শব্দ শোনা যাচ্ছে কাছাকাছি।
সেই সাথে শপাৎ শপাৎ করে মাটির উপর বাড়ি খাচ্ছে জলের ঢেউ। এখনো পুরোপুরি জোয়ার আসেনি। তাতেই প্রায় ঘরের কিনার পর্যন্ত চলে জলের ঢেউ।
সোমেন দাস তার নৌকাটা প্রায় ঠেলতে ঠলতে নিয়ে এসেছে দুলারিদের উঠোনের কাছাকাছি।
দুলারির বাবা চাঁদ গাজী আর সোমেন সমবয়সী বন্ধু। একই সাথে পদ্মার এই নতুন চরে এসেছিল তারা।
সোমেন ঝড়ের মধ্যে শীতের কাঁপুনিতে ঠকঠক করে। চেঁচিয়ে বলে, — এখনো উঠিসনা কেনরে চান্দ, ঘর আর টিকবে না এই জোয়ারে। মাল সামান সব নৌকোয় তুলে চল্ পাড়ি ধরি আন্ধার হবার আগে।
চাঁদ গাজীকে হতভম্ব দেখায়। চরের সবাই ঘর ছেড়ে দিতেছে? সবাই! কোথায় যাবে তারা! এক নৌকোয় এতদিনের সংসার। এত বছরের জমানো স্বপ্ন, — মুখের কথা নাকি সবকিছু!
কিন্তু জল বাড়ছে। সেই সাথে বাতাস গর্জন করছে মাতালের মতো। এরপর তো নদী পার হওয়াই মুশকিল হবে!
সোমেনের নৌকো, তারপর রহিম ফকির, তারপর তোতা মিয়া তারপর চাঁদ গাজী…… বড় বড় শক্ত দড়ির সাথে একটা নৌকা আরেকটার সাথে আটকে নিয়েছে তারা। দুলারির মা হাতুম হুতুম করে জিনিসপত্র বোঝাই করে নৌকোয়। কি- ই বা আছে তাদের। মাটির চুলো, সের পাঁচেক মোটা চাল, বড় একটা প্লাস্টিকের বয়ামে পোরা তিন কেজি লাল আটা যা গতকালই কিনে আনা হয়েছে গঞ্জ থেকে। তেল নুন লাকড়ি কিছু। কয়েকটা পুরনো কাঁথা কিছু কাপড় চোপড় এতেই নৌকোর ছইয়ের অংশটুকু বোঝাই হয়ে গেছে। শুধু মানুষগুলো বাকি এখন। মোরগ আর মুরগিটাকে ছেড়ে দিয়েছে দুলারির মা। যাহ্, দ্যাখ, তোরা ঘরের চালার উপর বসে কোনওমতে যদি বাঁচতে পারিসরে!
দুলারিকে তাগাদা দেয় করিমন, যা, গিয়ে নৌকায় উঠে ছইয়ের ভিতরে গুটিসুটি মেরে বসতে পারিস কিনা। চাঁদ গাজী নৌকার এক মাথায় হাল ধরে বসেছে। বাতাসের বাড়ি খেয়ে তার চেহারা শক্ত খরখরে খেজুর গাছের মতন হয়ে গেছে। আরেক পাশে প্লাস্টিকের একটা বড় বস্তা কাপড়ের মত শরীরের সাথে পেঁচিয়ে বৈঠা হাতে বাবাকে সাহায্য করছে দুলারির বড়ভাই পরান।
দুলারি ভিমরি খায় হঠাৎ। এই ঝড়ে- জলে তার হাঁসের ছানাগুলোকে কোথায় ফেলে রেখে যাবে সে। তারা তো গভীর জলে সাঁতারও জানেনা তেমন। নদীর কিনারই এতদিন ছিল তাদের ভরসা। দুলারি টুকরিটা বগলে আটকায়। তার মা করিমন কটমট করে তাকায়। —মানুষেরই বাঁচন দায়, তুই আইছোস ছানাপোনা নিয়া!
দুলারি আরো শক্ত করে সমস্ত শক্তি দিয়ে টুকরিটা আঁকড়ে ধরে। কিন্তু বাতাস আর জলে দলা পাকিয়ে হড়বড় করে এসে আছড়ে পড়ে নৌকার পাশে। হকচকিয়ে টুকরি থেকে একটা ছানা ছিটকে বেরিয়ে যায়। চিঁ চিঁ করে করেকবার বড় খলবলে ঢেউয়ের ভিতরে তার ডাক শোনা যায়, তারপর অন্ধকারে হারিয়ে যায় সে।
তিনটে হাঁসের ছানা লাল সবুজ রঙের টুকটির ভিতরে নিয়ে টুকরিটা বুকের ভিতরে চেপে নৌকার ছইয়ের মধ্যে গিয়ে নিজেকে হাঁড়ি -পাতিল সংসারের মধ্যে গুঁজে দেয় দুলারি। বাইরের খোলা পাটাতনের উপর ঝড় বৃষ্টির মধ্যে বসে কাঁপছে দুলারির মা। দুলারির বাবা নৌকোর হাল ধরে ঠায় বসে থাকে। আপাততঃ কোনও তীরে ভীড়তে চায় তারা।
পরের গন্তব্য আর জানা নেই তাদের।

(‌লেখক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী, বর্তমানে
প্রিন্সিপাল অফিসার, সোনালী ব্যাংক লি.খুলনা)

Facebook Comments


এ জাতীয় আরো খবর