সংবাদমাধ্যম : ব্ল্যাকআউট ও ভাসুরের নাম

রনি মন্ডল | রাজবাড়ী টেলিগ্রাফ / ৪৯ বার পড়া হয়েছে
সর্বশেষ আপডেট : রবিবার, ২ মে, ২০২১

0Shares

সংবাদমাধ্যম : ব্ল্যাকআউট ও ভাসুরের নাম

খবরের কাগজে যাঁরা কাজ করেছেন তাঁরা ইংরেজিতে ব্ল্যাকআউট শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। blackout মানে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে নিষ্প্রদীপ, জ্ঞান হারানো অবস্থা ইত্যাদি বোঝায়, তবে সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে সেটা ‘নিউজ ব্ল্যাকআউট’ অর্থাৎ কোনো খবর সম্পূর্ণ গোপন করা, না ছাপানো, প্রকাশ না করা। এ-রকম করতে হয় বাইরের চাপে (external pressure, এটাও সংবাদশাস্ত্রের পরিভাষা) তথা সামরিক বা স্বৈরাচারী সরকারের নির্দেশে, মাফিয়ার ভয়ে ইত্যাদি কারণে। এগুলো সম্পাদক বা সাংবাদিকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, বাধ্য হয়ে। ভেতরের চাপও (internal pressure) আছে। মালিক বা সম্পাদকের ভীষণ অপছন্দের বা স্বার্থহানিকর, তাদের ব্যবসায়িক বা পারিবারিক কোনো কেলেঙ্কারির খবর অনেক সময় একেবারে চেপে যাওয়া হয়। সে-রকম ঘটনার সংবাদমূল্য থাকলে এবং মানুষের তা জানার আগ্রহ থাকলে তা ব্ল্যকআউট করার ফলে সংশ্লিষ্ট খবরের কাগজ বা সংবাদমাধ্যম খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখন (২৭শে এপ্রিল থেকে) এমন অবস্থা হয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন চারটি মিডিয়ার– সংবাদপত্র ‘কালের কন্ঠ’, ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’, অনলাইন পোর্টাল ‘বাংলানিউজ24.কম’ ও টিভি চ্যানেল ‘নিউজ টুয়েন্টিফোর’। দেশের বৃহত্তম এই শিল্প গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরের একটি ফৌজদারি মামলার আসামি হওয়ার ঘটনার খবর এক অক্ষরও তারা প্রকাশ করতে পারছে না। মামলাটি হয়েছে এক কলেজছাত্রীকে প্রতারণা করে তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার অভিযোগে। বসবাসের ফ্ল্যাটে মেয়েটির মৃতদেহ গলায় ওড়না পেঁচানো ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেলেও এটা আত্মহত্যা না হত্যা তা এখনও তদন্তাধীন। এই আলোড়ন তোলা ক্রাইম নিউজটি প্রকাশ না করায় মিডিয়া চারটিকে নিশ্চিতই ভাবমূর্তি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছু ক্ষতি মেনে নিতে হবে। ইতিমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক গালমন্দ ও ট্রলের শিকার তারা হয়েছে। ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে যেহেতু পাঠকদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, লাইক-কমেন্টের বাণিজ্যিক মূল্যও আছে সেহেতু এই ক্ষতি এখন ছাপানো সংবাদপত্র যুগের চেয়ে বেশি।

খবর যদি সত্য হয়, তথ্যভিত্তিক হয়, আবার মালিক বা মালিকরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাহলে মালিকপক্ষের অপছন্দনীয় হলেও তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক বক্তব্যসহ বস্তনিষ্ঠভাবে খবরটি প্রকাশ করার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতে সম্পাদকদের সচেষ্ট হওয়া উচিত।

এই ঘটনাটির খবর পরিবেশনে বেক্সিমকোর চারটি ছাড়া প্রথম দিন অন্য বড় বড় মিডিয়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার মুখে পড়েছে। কারণ ওই মিডিয়াগুলির কোনো কোনোটি খবরে বসুন্ধরার এমডির নাম উল্লেখ করেনি। হতভাগিনী মেয়েটির ছবিসহ সম্পূর্ণ পারিবারিক পরিচয় অত্যন্ত গর্হিত অনৈতিকভাবে প্রকাশ করলেও আসামির নাম ও পরিচয় শুধু ‘একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ বলে এড়িয়ে গেছে। শিল্প প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নাম উহ্য রাখা হয়েছে। আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় পুলিশ যখন আদালত থেকে সায়েম সোবহান আনভীরের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আদেশ বের করলো তখনই ওই মিডিয়াগুলোর কোনো কোনোটিতে নাম প্রকাশ শুরু হয়, তার আগে নয়। আমাদের দেশে বড় বিজ্ঞাপনদাতাদের বিব্রত না করার জন্য সপ্রণোদিত হয়ে খবর প্রকাশে বিরত থাকা বা খণ্ডিত খবর প্রকাশের প্রবণতা বাড়ছে। এদিক থেকে তো সরকারই উদার। প্রতিনিয়ত সরকারি বিজ্ঞাপন নিয়েও মিডিয়া সরকারের সমালোচনা করতে পারছে। বিজ্ঞাপন না পেলে প্রতিবাদও করতে পারছে। এই অধিকারটি বেসরকারি বিজ্ঞাপনদাতার বেলায় খাটানো যাচ্ছে না।

এ তো গেল খবর ব্ল্যকআউটের কথা। কিন্তু বিস্তারিত খবর পরিবেশন করেও খবরের প্রধান চরিত্রের নামটি কেবল উহ্য রাখার এক বিচিত্র নমুনা দেখলাম ভালো কাটতি আছে এমন মূলধারার একটি দৈনিকে। ঘটনার তৃতীয় দিন পর্যন্ত খবর ছাপিয়ে তারা বসুন্ধরার এমডির নামোল্লেখ করেনি। ‘একটি শিল্পগ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ ছাড়া সুপরিসর খবরে তাদের বারবার লিখতে হয়েছে ‘আসামি’ এবং একবার লিখেছে ‘বয়ফ্রেন্ড’! বেচারা প্রতিবেদক তথ্যের জন্য পুলিশ ছাড়াও হতভাগিনী মেয়েটির বোনকে ফোন করে দুলাভাইর সঙ্গে, এমনকি ফ্ল্যাটবাড়িটির দারোয়ানের সঙ্গে কথা বললেও কেবল কথা বলার চেষ্টা করেনি ‘আসামি’র সঙ্গে।

সংবাদপত্রের ওপর চাপের কথা জানি, কিন্তু সংবাদপত্রের যে ‘ভাসুর’ থাকে, যার নাম নেওয়া যায় না, সেটা এমনভাবে আর দেখিনি
( Muzzamil Husain Manju ফেসবুক থেকে নেয়া)

Facebook Comments


এ জাতীয় আরো খবর
NayaTest.jpg