শিরোনাম
গোয়ালন্দে পৌর কৃষক লীগের উদ্যোগে গাছের চারা বিতরণ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিপারের অপেক্ষায় পণ্যবাহী শত শত ট্রাক আটকা রাজবাড়ী জেলা পরিষদের ২নং ওয়ার্ডের উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত বেতনে সংসার চলে না, পদত্যাগের কথা ভাবছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ধর্ষকদের বিরুদ্ধে তীব্র সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে ৭ দফা দাবিতে সরকারি কলেজ শিক্ষক সমিতির মানববন্ধন ৭১ উপজেলায় মধ্যে রাজবাড়ীর পাংশাতেও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে গোয়ালন্দ পৌরসভার মেয়র প্রার্থী কি হবেন শেখ শালিমুজ্জামান হিরন ছাতকের পল্লীতে ধর্ষণ মামলায় পুলিশের হাতে যুবক গ্রেফতার

দারিদ্র্যজয়ী কিশোর দরিদ্রদের পাশে

রাজবাড়ী টেলিগ্রাফ ডেস্ক / ২৮ বার পড়া হয়েছে
সর্বশেষ আপডেট : বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২০

সংবাদটি শেয়ার করুন

কিশোর কুমার দাস (৩৬)। চাকরির সুবাদে ঘুরছেন দেশ-বিদেশ। বর্তমানে আছেন সুদূর দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতে।

কর্মজীবনে সফল এই পেশাদার কর্মকর্তার জীবনের পেছনের গল্পটা এমন নয়। শৈশব কেটেছে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে। ২০ বছর আগের চট্টগ্রাম নগরীর কালুরঘাটের এক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠান শেষে খাবার বিতরণ হচ্ছিল। তখন ১৪ বছরের কিশোর অন্যদের মতো লাইনে দাঁড়িয়েছিল এক প্লেট খাবারের আশায়। কিন্তু সেখানে অসংখ্য মানুষের ভিড় ঠেলে ফিরে আসতে হয়েছিল খালি হাতে। তখনই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, একদিন এমন কিছু করবেন যাতে সুবিধাবঞ্চিত মানুষরা খাবারের জন্য কোনো কষ্ট না পায়।

দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে কলাপাতার ওপর সামান্য খাবার পেয়েছিলেন একবার। তা নিয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে ছুটেছিলেন বাড়িতে। মা’কে নিয়ে একসঙ্গে খাবেন তাই। পথে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে সব খাবার নষ্ট হয়ে যায়।

আজ তার ক্ষুধার কষ্ট নেই। কিন্তু, ভোলেননি সেই অতীত। অতীতকে স্মরণ করেই তিনি দাঁড়িয়েছেন দেশের শ’ শ’ ক্ষুধার্ত সুবিধাবঞ্চিতের পাশে। তারই প্রতিষ্ঠিত বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন এখন প্রতিদিন দুই বেলা ‘এক টাকায় আহার’ বিতরণ করে দেশের প্রায় চার শ’ পথশিশুর মধ্যে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের রামুতে প্রতিদিন দুপুরে ও রাতে শিশুরা সংগ্রহ করে এক টাকায় আহার। তিনি বলেন, শিশুরাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় খাবারের জন্য। খাবার যোগাড় করতে অনেকেই বাধ্য হয় শিশুশ্রমে, চুরি করতে। পড়াশুনার কথাতো চিন্তাই করতে পারে না তারা অন্ন সংস্থানের চিন্তায়। এজন্যই এ বছরের ১৫ই মে থেকে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন ‘এক টাকায় আহার’ প্রকল্প চালু করে।

খাবার বিতরণের সঙ্গে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবীরা জানান, প্রতীকী এই এক টাকা নিয়ে শিশুদের মধ্যে স্বাবলম্বি হওয়ার আগ্রহ সৃষ্টির প্রত্যাশা রয়েছে আমাদের। শিশুরা যাতে ভিক্ষা বা দান নির্ভর না হয় সেটাই এই এক টাকা মূল্য নির্ধারণের উদ্দেশ্য।

নিয়মিত খাবার মেন্যুতে থাকে ভাত, সবজি আর ডাল। তবে কেউ অনুদান দিলে খাবারের মেন্যুতে মুরগির মাংস, মাছ, ডিম, খিচুড়ি আর পোলাও দেয়া হয়। কোনো কোনোদিন করা হয় মিষ্টান্নের ব্যবস্থাও।

শুক্রবার ঢাকা, চট্টগ্রাম, রামু ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ ও রাজবাড়ীতে বিতরণ করা হয় এক টাকার খাবার। এদিন আয়োজন করা হয় সাত শ’ জনের অধিক মানুষের খাবার। এই খাবারের রান্না করা হয় ভাড়ায় নেয়া রান্না ঘরে দক্ষ রাঁধুনীর হাতে। বিতরণের আগে যাচাই করা হয় খাবারের মান। চট্টগ্রামে খাবার বিতরণের জন্য খোলা হয়েছে ‘ফুডভ্যান’।

ঢাকার বিমানবন্দর রেল স্টেশন ও গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে প্রতিদিন বিতরণ করা হয় এসব খাবার। সেচ্ছাসেবীরা জানান, দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত লেকদের জন্যই এই খাবার দেয়া হয়। শিশুরা ছাড়াও অনেক দরিদ্র, শ্রমজীবী এই খাবার খেয়ে উপকৃত হন। নিয়মিত খাবার বিতরণের পাশাপাশি কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় বন্যার্তদের মাঝে গত আগস্ট মাসে বিতরণ করা হয় প্রায় ৫৪ হাজার জনের খাবার। রমজান মাসে সেহরি ও ইফতার বিতরণ করা হয় ৩৫ পঁয়ত্রিশ হাজার লোকের মধ্যে।

পেরু থেকে কিশোর কুমার টেলিফোন ও ই-মেইলে সংবাদমাধ্যমকে জানান, আমি নিজে শৈশবে একজন সুবিধাবঞ্চিত শিশু ছিলাম। তখন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, কোনোদিন যদি টাকা উপার্জন করতে পারি তাহলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আমিও কিছু করবো।
২০১৩ সালের ২২শে ডিসেম্বর তিনি শুরু করেছিলেন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন।

কষ্টের শৈশবের কথা জানিয়ে কিশোর বলেন, আমার নিজের শৈশবের কোনো ছবি নেই। এখন তিনি বিদ্যানন্দের উদ্যোগে ১০ হাজার শিশুর ছবি তুলে তা প্রিন্ট ও লেমিনেটিং করে শিশুদের হাতে তুলে দিয়েছেন। বলছেন, শিশুদের অধিকার আছে তাদের শৈশবকে স্মরণীয় করে রাখার। কিশোর বলছিলেন, আমি কিছু শারীরিক জটিলতা নিয়ে জন্ম নিয়েছিলাম। আমি কিছু মনে রাখতে পারতাম না। আরও নানা কারণে আমার শৈশবটা আসলে আনন্দময় ছিল না। কিন্তু, আমার অন্য ভাইবোনরা ছিল খুব মেধাবী, জীবনের ওই সময়টা ছিল খুব হতাশার। বাবা ছিলেন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। উনি অবসরে যাওয়ার পরে আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় টাকার অভাবে। তখন আমি কেবল এসএসসি পাস করেছি। যদিও ভাইবোনদের লেখাপড়া চলছিল। তখন কতোজনকে ইনিয়ে বিনিয়ে বলেছি, কিন্তু পড়ার জন্য আমি অর্থের সংস্থান পাইনি। শেষ পর্যন্ত দুই বছর পর একজন শিক্ষকের সহযোগিতায় আমি লেখাপড়ার করার সুযোগ পাই আবার।
এরপর কম্পিউটার সায়েন্স-এ ভালো একটা ফল নিয়ে পাশ করলাম চুয়েট থেকে।

২০০৬ সালে বিডিকমে চাকরি পান তিনি। এরপর আর পিছিয়ে থাকতে হয়নি। দ্রতই পদোন্নতি পেয়েছেন সর্বত্র। বিডিকম থেকে এয়ারটেল। আরও একাধিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। ২০১১ সাল থেকে পেরুতে একটি বহুজাতিক কোম্পানির হেড অব মার্কেটিং পদে আছেন কিশোর কুমার। ২০১৩ সালের আগস্টে বড় বোন শিপ্রা দাশের সঙ্গে আলাপ করেই সিদ্ধান্ত নেন কিছু একটা করবেন সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য। ওই বছরই নারায়ণগঞ্জের বন্দরথানার সাব্দি গ্রামে পাঁচজন ছাত্র নিয়ে স্কুল শুরু করেন শিপ্রা।

শিপ্রা জানাচ্ছিলেন, আমাদের গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। এখন আমরা বিদ্যানন্দের স্কুল ও বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম চালাচ্ছি চারটি জেলায়। পরের বছর মার্চে চট্টগ্রামে এবং জুলাইতে ঢাকার মিরপুরে বিদ্যানন্দের শাখা খোলা হয়। বিদ্যানন্দের প্রতিটি শাখায় সংগ্রহ করা হয় হাজার হাজার বই। সেখানে শিশুরা পড়াশুনা করতে পারে সারা দিন। এছাড়া বিদ্যানন্দের উদ্যোগে এখন চলছে একটি এতিমখানা তৈরির কাজ। এজন্য কক্সবাজারের রামুতে ১৮ শতক জায়গা দিয়েছেন এক ব্যক্তি। সেখানে বাঁশঝাড় পরিচ্ছন্ন করে গড়ে তোলা হবে এতিমখানা।

কিশোর জানান, পরিকল্পনা এবং শুরুটা ব্যক্তিগত উদ্যোগে হলেও এখন তিনি সঙ্গে পেয়েছেন আরও ক’জন সহযোদ্ধা ও সেচ্ছাসেবী। টাকারও একটি বড় অংশও দিয়েছেন তিনিই। এখন অনেকেই সেখানে আর্থিক অনুদান দিচ্ছেন। অনেকে দিচ্ছেন সময় ও শ্রম। ফাউন্ডেশনের রয়েছে চারজন শাখা প্রধান। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমারের স্বপ্ন, একদিন বাংলাদেশের সব স্কুলে ও বিভিন্ন জায়গায় এক লাখ সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে প্রতিদিন এক টাকায় খাবার বিতরণ করবেন। বর্তমানে বিদ্যানন্দের বিভিন্ন শাখার প্রায় ৫৫ জন রেজিস্ট্রার্ড স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন।

Facebook Comments


এ জাতীয় আরো খবর