শিরোনাম
রাজবাড়ীতে নতুন করে ৩ জন করোনা আক্রান্ত , মোট মৃত্যু ২৪ জন ফ্রান্সে মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স.)এর ব্যঙ্গ চিত্র প্রকাশের প্রতিবাদে রাজবাড়ীতে বিক্ষোভ মিছিল পাংশায় পদ্মা নদীতে জেলের জালে ধরা পড়ল ১৭ কেজি ওজনের বাগাড় মাছ মার্কিন নির্বাচনে আগাম ভোট দিয়েছেন ৮ কোটির বেশি মানুষ রাজবাড়ী – ভাঙ্গা রুটে মধুমতি এক্সপ্রেস আজ থেকে চলাচল শুরু আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) সর্বাধিক অনলাইন ক্লাস গ্রহণ করায় রাজবাড়ীতে দশ জন শিক্ষককে সন্মাননা স্মারক প্রদান ফ্রান্সে মোহাম্মদ সা. এর ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শনের প্রতিবাদে রাজবাড়ীতে বিক্ষোভ সমাবেশ ফ্রান্সে ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শনের প্রতিবাদে গোয়ালন্দে বিক্ষোভ সমাবেশ রাজবাড়ীতে কোর্ট হাজতে আসামীর আত্মহত্যা

বাবাকে নিয়ে স্মৃতি কথা

নিউজ ডেস্ক | রাজবাড়ী টেলিগ্রাফ / ৭৯ বার পড়া হয়েছে
সর্বশেষ আপডেট : রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সংবাদটি শেয়ার করুন
  • 19
    Shares

স্মৃতির পাতায় অনেক কথা, দেখতে দেখতে তিনটি বছর পার হয়ে গেল। আজ (২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০)আমার বাবার তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী ।
আমি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হওয়ার পর আমার বাবা খুব বেশি চিঠি লিখত তেমনটি মনে পড়ে না, তবে মাঝে মাঝে লিখতো। একটা চিঠির কথা আজ খুব মনে পড়ছে, কোন এক দুপুরে আমি ক্লাস থেকে হলে ফিরে চিঠিটা পেলাম, আমি তখন অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ি। চিঠিতে বাড়ির সকলের খবর সহ টাকাপয়সা পাঠিয়েছি এসব বিষয় ছাড়াও একটি মূল্যবান কথা ছিল। “ছাত্র জীবনে বই পড়ার যত সুযোগ পাওয়া যায় কর্মজীবনে সেটা সম্ভব হয় না। এই সুযোগটাকে কাজে লাগাতে হবে।” সত্যি বিষয়টা তখন অতোটা উপলব্ধি করতে পারিনি। এখন অনেক ব্যস্ততা অফিস, পরিবার সহ অন্যান্য সামাজিকতা বজায় রেখে নিত্য দিনের ব্যস্ততা নিয়ে জীবন চলছে। সময়ের বেশ টানাপোড়েন থাকে সব সময়। বই পড়ার সুযোগটা আসলেও সীমিত হয়ে এসেছে। বই পড়া নিয়ে উনার এই জীবন অনুভূতিটা আমাকে আজও খুব আনন্দিত করে। কারণ আমার বাবার ছাত্র জীবনটা খুব দীর্ঘ ছিল না। কিন্তু ঠিকই উনি , এই অনুভবটা করতে পেরেছিলেন বইয়ের সাথে প্রেমের কারনে।
প্রায়ই আমরা তিন ভাই-বোন ওনার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতাম। অনেক সময়ই যুক্তি – পাল্টা যুক্তি দেওয়ার সুযোগ হত। বিশেষ করে পরিবারের অনেক বিষয়ে। আমি হয়তো বললাম অমুক এটা করেছে আমাদের এটা দরকার। আব্বা খুব সুন্দর যুক্তি দিয়ে বলতো শোন, জীবনের সব সময় চিন্তা করতে হবে মডেল হওয়ার, যেন অন্যরা তোকে অনুসরণ করে। কথাটা আমার মনে খুব ধরেছিল। অনেক ক্ষেত্রে অনেক কিছু চেষ্টা করেছি কিন্তু সব ক্ষেত্রে হয়ে ওঠা হয়নি।

এসএসসি পরীক্ষার কয়েক মাস আগে আমাদের স্কুল থেকে আমাদেরকে সনেট ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়িতে (যশোর) নিয়ে যাওয়া হল, শিক্ষা সফরের অংশ হিসেবে। খুব ভালো লেগেছিল, তুমুল হইচই আর এক ঝাঁক তরুণ সেদিন সাগরদাঁড়ি গিয়েছিলাম। মনে পড়ে একটি উঁচু জায়গায় দেওয়ালে মাইকেল মধুসূদন মধুসূদন দত্তের একটি ছবি জন্ম তারিখ সহ, ঘরের মধ্যে অনেক ছবি টাঙ্গানো এবং ব্যবহার্য কিছু জিনিস ছিল। ঠিক যে বাড়িটা, তার পাশ দিয়ে একটা সংকোচিত নদী বা খাল প্রবাহিত ছিল। যেটাকে আমি কপোতাক্ষ নদ ই বলছিলাম। সাগরদাঁড়ি থেকে ফেরার সময় শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মন্ডলী আমাদেরকে বিখ্যাত মনিহার সিনেমা হলে একটি মুভি দেখার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ফিরতে একটু রাত হলো। পরের দিন সকালে আব্বা আমাকে জিজ্ঞাসা করল ওখানে গিয়ে আমি কি দেখলাম? কি শিখলাম? কিছু উত্তর দিলাম। পরে আব্বা আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, বলতো কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মায়ের নাম কি?
আমি বলতে পারলাম না। বেশ লজ্জা পেলাম, নিজেকেই প্রশ্ন করলাম তাহলে কি দেখলাম? আব্বা বললেন উনার নাম ছিল জাহ্নবী দেবী উল্লেখ্য বাবার নাম ছিল রাজনারায়ণ দত্ত। ২৪ বছর আগে জেনেছিলাম, আজ নামটা দিব্যি মনে আছে। আব্বা আপনাকে বলতে চাই এই নামটা সারাজীবনই মনে থাকবে। ঠিক ইংরেজির কিছু ছোটখাটো গ্রামার আজও মনে আছে যা আপনার কল্যাণেই শিখেছিলাম।

একদিন দুপুরে আমরা তিন ভাই-বোন বাড়িতে আছি আব্বাকে হয়তো কোন প্রসঙ্গে টাকার বিষয়ে কথা বলেছি, তখন উনি বললো কোন বিষয় এত অস্থির বা উতলা হওয়ার কিছু নেই সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বরাবর এটা বলতো। তখন আমি বললাম আমিতো কোন পথ দেখিনা, তখন উনি কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের একটা ঘটনা আমাদেরকে বললেন।
“কাজী নজরুল ইসলাম খুব ভ্রমণপিপাসু লোক ছিলেন। একবার ভ্রমণে গিয়েছিলেন পরিবারের সদস্যসহ, কয়েকদিন পরে যখন বাড়িতে ফিরে আসলেন তখন যে বাহনটি (সম্ভবত গরুর গাড়ি)নিয়ে এসেছিলেন সেই বাহনের ভাড়া দেয়ার মত টাকা তার কাছে ছিলনা। কিন্তু তৎসময়ে তিনি ব্যবস্থা করেছিলেন। সে কিন্তু আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।”তখন আমার আর কিছু বলার ছিল না ।

আমরা সবসময়ই বেশ স্বাধীন জীবন যাপন করেছি। অনেক বিষয়ই নিজে যেটা মনে করতাম অনেক ক্ষেত্রে করার সুযোগ পেতাম শুধুমাত্র আব্বার জন্যই পারতাম। আমার মনে পড়ে, আমার ছোট ভাইটা বেশ কয়েকটি স্কুলে পড়েছে, ও আব্বা কে বলতো “স্কুল টা আমার ভালো লাগছেনা” আব্বা বেশ উৎসাহের সাথে পরিবর্তন করিয়ে দিত।

খুব অল্প বয়সেই একটু ভিন্ন ধরনের গানের টেস্ট পেয়েছিলাম। কিশোর বয়সেই শুনেছি গীতা দত্ত, চিত্রা সিং, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, শচীন দেব বর্মন, লতা মঙ্গেসকাসহ বিখ্যাত শিল্পীর গান। আমি যখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি তখনই আমি দেখেছিলাম অশনিসংকেত মুভিটা। ধর্ম ও জীবন, নিজস্ব ধর্মীয় দর্শন, সাহিত্য, আঞ্চলিক ইতিহাস এসব বিষয়ে অসংখ্যবার উনার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়েছে। এখন অনেক সময়ই স্বল্প সময়ে কিছু জানার ইচ্ছা জাগলে খুব মিস করি।

মানুষটা নিজের শরীরের প্রতি খুব বেশি রকমের খামখেয়ালী ছিল। কখনোই নিয়মের মধ্যে ছিলেন না। গল্প করতে করতে অথবা দাবা খেলতে খেলতে দুপুর শেষে বিকেল গড়িয়ে যেত। ঠিক রাতের ক্ষেত্রেও তাই,গভীর রাত হয়ে যেত। অর্থাৎ দুপুরের খাবার খেত বিকেলে আর রাতের খাবার খেত গভীর রাতে। খুব মন ভোলা ছিল মানুষটা। জীবনে তিনটি কাজ খুব যত্ন সহকারে এবং আন্তরিকভাবে করেছিলেন ১। বই পড়া ২। দাবা খেলা ও ৩। রাজনীতি করা। লেখনি খুব ভাল ছিল। আমি বলতাম আব্বা আপনি কেন লেখেন না? আমাকে বলতো লিখে কি হবে? উনি বেশ প্রচারবিমুখ ও ছিলেন।
নিজের প্রতি এই অবহেলাই একটা সময় নিঃশেষ করে দিল। শরীরটা খারাপ হওয়া সত্ত্বেও ডাক্তারের কাছে যায়নি। হয়তো ভেবেছিল এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে, এমনকি আমাদের কাউকে জানায়নি। মৃত্যুর মাসখানেক বা বেশি আগে ঢাকা হার্ট ফাউন্ডেশন এর একজন সিনিয়র প্রফেসর কে দেখালাম, ডাক্তার বলেছিলেন এনজিওগ্রাম করাতে হবে। অনেক বড় ডাক্তার কিন্তু আচরণটা খুব বাজে ছিল। আব্বা মনে বেশ কষ্ট পেল। বের হয়ে বললাম আব্বা কাল ই ভর্তি হয়ে যান। আব্বা বলল দেখি কাল না সামনে ঈদ আছে ঈদের পরে ভর্তি হব। আব্বা পরেরদিন বাড়ি চলে আসলো।
গোয়ালন্দ বাজার, বাড়ি, রাস্তা, মাটি, মানুষ সব তাঁর কাছে অন্যরকম ছিল। কোথাও গেলে বাড়ি ফেরার জন্য তাঁর তারাটা থাকতো বেশ গতিময়। পক্ষান্তরে তার সকল কাজই ছিল বেশ আলস্য পূর্ণ ২৬ সেপ্টেম্বর (২০১৭)তারিখ রাতে আমি একটু দেরি করে ঘুমাই। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার মোবাইলে অনেক কল। আব্বা অসুস্থ হাসপাতালে ভর্তি। খুব কষ্ট নিয়ে অফিসে গেলাম খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল। দশটার দিকে শুনলাম আব্বার অবস্থা একটু ভালো। তাই ভাবলাম হয়তো আব্বা সুস্থ হয়ে যাবে। ঘন্টা দুয়েক পরে আব্বার শরীরটা প্রচন্ড রকম খারাপ হয়ে আসে। আমি অফিস থেকে বের হওয়ার ২০ মিনিট পরেই পথিমধ্যে আব্বার মৃত্যু সংবাদ শুনি। আমরা হারিয়ে ফেলি অভিমানী বাবাকে। একদিন আমার বাবার পিছে পিছে আমি হেঁটে যাচ্ছিলাম বাজারের মধ্য দিয়ে, পাশের দোকানের নরসুন্দর যে ব্যক্তির চুল কাটছিলেন তাকে বলছিল দেখেন দেখেন “এই লোকটা অনেক জ্ঞানী মানুষ”
এটাই আমাদের বাবার সবচেয়ে বড় উপহার আমাদের জন্য।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি উনাকে জান্নাত বাসী করুন।


লেখক-
মো: আরিফুল ইসলাম( আরিফ)
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী, বর্তমানে উন্নয়নকর্মী।

Facebook Comments


এ জাতীয় আরো খবর