খন্দকার লাইব্রেরী রাজবাড়ী
শিরোনাম

রাজবাড়ীর রেলের কথা

রাজবাড়ী টেলিগ্রাফ ডেস্ক / ৭৭৪ বার পড়া হয়েছে
সর্বশেষ আপডেট : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২০
রাজবাড়ীর রেলের কথা

সংবাদটি শেয়ার করুন
  • 982
    Shares

বাংলাদেশ সীমানায় রেল স্থাপনের পরিকল্পনা শুরু হয় ১৮৫২ সালে। বৃটিশ সরকার সার্ভে করে দুটো রুট ঠিক করে। কলকাতা হতে যশোর-ফরিদপুর হয়ে গোয়ালন্দ অথবা কুস্টিয়া হয়ে গোয়ালন্দ। ১৪টি বড় নদী থাকায় প্রথম প্রস্তাব বাদ হয়। ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে ১৮৬২ সালে শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট হয়ে জগতি পর্যন্ত রেল লাইন নির্মাণ সমাপ্ত করে ট্রেন চালু হয়। ১৮৭০ সালে গড়াই সেতুর নির্মাণ শেষ হলে ১৮৭১ সালে রেল লাইন গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। রাজবাড়ী অংশে রেলপথ পাংশা থেকে কালুখালীর বর্তমান স্টেশন হতে ২ কিমি উত্তরে বহর কালুখালী হয়ে ধাওয়াপাড়া ঘাট বরাবর ছিল। উক্ত রেলপথ বর্তমানে রাজবাড়ী শহরের উত্তর দিক দিয়ে পূর্ব পথে জামালপুর (তখন জামালপুর ছিল গ্যাঞ্জেস বন্দর বা গোয়ালন্দ ঘাট) পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এখনো কোনো কোনো স্থানে তার চিহ্ন রয়েছে। পরে প্রমত্ত পদ্মার ভাঙনে কালুখালী স্টেশন কে সরিয়ে রতনদিয়া আনা হয়।অল্পদিনের জন্য অস্থায়ী একটি লাইন করা হয় হারোয়ার উপর দিয়ে। কলকাতা হতে চাঁগাঁ মেইলে কালুখালী সাড়ে ৪ ঘন্টার পথ ছিল।

১৮৯০ সালে রেল পাংশা, বর্তমান কালুখালী, বেলগাছি, সূর্যনগর, রাজবাড়ী ভায়া লোকোসেডের পশ্চিম দিয়ে উত্তরমুখী দুর্গাপুর, তেনাপচা গোয়ালন্দ ঘাট পুন:স্থাপিত হয়। এ সময় রেলওয়ে অফিসার্স কোয়াটার সহ স্থাপিত হয় রেলওয়ে খেলার মাঠ, হোসেনবাগ হল (এস আর হল), রেলওয়ে ক্লাব, ইয়াছিন স্কুল, লোকোসেড, রেস্ট হাউস ইত্যাদি। রেলওয়ে কলোনি ১৯৪৭ সালে স্থাপন করা হয়। রাজবাড়ী স্টেশন টা আধুনিকায়ন হয় ১৯৬০ এর দশকে। রেল সূত্রে কয়লার ব্যবসায় কিছু ব্যবসায়ী প্রচুর লাভবান হন তার মধ্যে গোলজার হাজি অন্যতম।

১৮৯৫ সালে পাচুরিয়া হয়ে রেল বর্তমান গোয়ালন্দ বাজার পর্যন্ত পুন:স্থাপিত হয়। এরপর পাচুরিয়া থেকে অম্বিকাপুর (আমিরাবাদ) রেল বসে ১৮৯৯ সালে। খানখানাপুর, বসন্তপুর রেল স্টেশন এ সময় স্থাপিত হয়। দক্ষিনাঞ্চলের বা্ঁশ, বেত, পাট বহনের জন্য ১৯৩২ সালে কালুখালী হতে ভাটিয়াপাড়া পর্যন্ত রেল স্থাপিত হয়, সৃষ্ট হয় রামদিয়া, বহরপুর, আড়কান্দি,জামালপুর স্টেশন। গোয়ালন্দ ঘাটের মুখে পলি জমে চর পড়লে ১৯৭৭ সালে রেলপথ দৌলতদিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। দৌলতদিয়া পর্যন্ত রেল স্থাপনে আক্কাছ আলি মিয়া (রাজবাড়ী পৌরসভা চেয়ারম্যান ১৯৭৩ সালে কাজি হেদায়েত হোসেন কে পরাজিত করেন) বিশেষ ভূমিকা রাখেন, তার জন্যই ফরিদপুর শ্রীরামদি ঘাটে রেল বাতিল হয়ে দৌলতদিয়া আসে। অত্র অঞ্চলে রেলের ঠিকাদারি করে পাবনার সাগরদাঁড়ি গ্রামের গোবিন্দ দত্ত ও গুরুচরন দত্ত প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হন।

রাজবাড়ী পাবলিক লাইব্রেরি পশ্চিমে রাস্তার মোড়ে বাধানো একটা কবর আমরা দেখি সেটা আসলে রেলের উচ্চ পদস্থ এক ইংরেজ এই এন সাহেবের স্ত্রীর যে কিনা প্রেম করে বাগদিপাড়ার এক মেয়েকে বিয়ে করেছিল এবং কয়েক বছর পরেই কলেরা আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। রাজবাড়ী আসলে রেলের শহরই বলা যায় , রেলের মাধ্যমে কলকাতা সহজে যোগাযোগের কারনে শিক্ষা সংস্কৃতি বিকাশ ঘটে। ১৯৪০ সালে রেল কতৃপক্ষ কালুখালি-ভাটিয়াপাড়া লাইন প্রশাসনিক জটিলতা ও অব্যবস্থাপনার জন্য বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। রাজবাড়ী-ফরিদপুর এলাকার অধিবাসীদের জন্য এই লাইন ‘Life cord’ নামে পরিচিত।

রেল স্থাপনের পর গোয়ালন্দই একমাত্র সংযোগ কেন্দ্র যেখান হতে ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, কুমিল্লা, সিলেট, আসাম, চট্রগ্রাম থেকে স্টিমারযোগে এসে রেলগাড়িতে চড়ে কলকাতা যাতায়াত হত। কলকাতা হতে ঢাকা মেইল, ওয়ান আপ টু ডাউন, ওয়ান আপ টু আপ প্রভৃতি দ্রুতগামী ট্রেন চলত। অস্ট্রিচ,ইমু,কাওয়াই প্রভৃতি স্টিমার ট্রেনের যাত্রী ও মালামাল বহন করত। গোয়ালন্দ-ঢাকা, গোয়ালন্দ-নারায়নগঞ্জ, গোয়ালন্দ-ডিব্রুগড় (আসাম) স্টিমার চলত। পদ্মা, গড়াই এমন কি চন্দনা নদীতে স্টিমার চলত।গোয়ালন্দের ইলিশ, পাঙ্গাস, তরমুজ, চিনি, মশলা ভারত বিখ্যাত ছিল। কলকাতা ও দিল্লীতে গোয়ালন্দের ইলিশ ও তরমুজের হাট বসত। ১৮৯১ সালের আদমশুমারিতে ততকালিন ফরিদপুরের জনসংখ্যা ছিল ৯৬ হাজার।

শিলিগুড়ি এক্সপ্রেস: বৃটিশ আমলে গোয়ালন্দ ঘাট হতে ট্রেন ইশ্বরদি-সান্তাহার-পার্বতীপুর-চিলাহাটি হয়ে শিলিগুড়ি যেত। ৪৭ এর দেশভাগের পর এটা পার্বতীপুর পর্যন্ত যেত। ২০১১ এর জুলাই হতে ট্রেনটি বন্ধ আছে।

মেদিনীপুর স্পেশাল ওরশ ট্রেন: রাজবাড়ী হতে পশ্চিমবঙ্গের মেদিনিপুর প্রতি বছর ওরশের সময় এই আর্ন্তজাতিক ট্রেন যায়। ১৯০২ সাল হতে এটা আজও চলছে। হযরত আব্দুল কাদির জ্বিলানী (র:) এর ২০ তম বংশধর এখন গদীনশিন পীর। ২ ফাল্গুন হতে ৪ ফাল্গুন ওরশ হয়।প্রতি বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি ট্রেন টি দর্শনা বর্ডার হয়ে মেদিনিপুর যায় এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি ফেরত আসে। ট্রেনটি প্রায় ২২০০ যাত্রী নেয়। আঞ্জুমান কাদেরিয়া এটার ব্যবস্থাপনায় থাকে। রাজবাড়ী বড় মসজিদ খানকা শরীফ তাদের অফিস। এই ওরশে পাবনা, কুস্টিয়া, ঢাকা, ফরিদপুর সহ বিভিন্ন জেলার লোক অংশ নেয়।

মধুমতি এক্সপ্রেস: গোয়ালন্দ ঘাট টু রাজশাহী যায় ভায়া কুস্টিয়া ইশ্বরদি

নকশিকাঁথা এক্সপ্রেস: গোয়ালন্দ টু খুলনা ভায়া -চুয়াডাঙ্গা যশোর

রাজবাড়ী এক্সপ্রেস: রাজবাড়ী টু ফরিদপুর হয়ে -ভাটিয়াপাড়া ভায়া কালুখালি জংশন

কুস্টিয়া লোকাল: গোয়ালন্দ ঘাট টু পোড়াদহ

বর্তমানে এই ৪টি ট্রেন চলে রাজবাড়ী স্টেশন হতে।

পদ্মা সেতুতে রেল চালু হলে -ফরিদপুর ভাংগা হয়ে ঢাকা ট্রেনের দাবি থাকল!!
লোকোসেড এক সময় জমজমাট ছিল, মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্মৃতির সাক্ষী এর পাশে কুয়া (ইদারা)। রাজবাড়ী এক সময় অবাঙ্গালী বিহারি ছিল প্রায় ২০ হাজার, এখন অনেক কমে গেছে।

লেখক, আব্দুল্লাহ আল মামুন
নির্বাহী প্রকৌশলী, গণপূর্ত বিভাগ, রংপুর।

Facebook Comments


এ জাতীয় আরো খবর